মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১ : ১১:৩০ অপরাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

নারীর হাতে অটোরিকশার স্টিয়ারিং

সিলেটভিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম : বাবা মারা যাবার পর ৬ ভাই বোনের সংসারে সুফিয়া ছিল যেন বাড়তি বোঝা। কেননা বিয়ের এক বছরের মধ্যে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তাই নিজের ভাই বোনেরাও পর হয়ে যায়। কিন্তু হার মানেনি সুফিয়া। অনেকের কটূক্তি আর বাধা অতিক্রম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলার পথ খুঁজে বের করেছেন। প্রশিক্ষিত হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে হাল ধরেছে সংসারের।

সুফিয়ার মতোই আমিনা, মরিয়ম, ঝিনুক, আলতাফুন এখন স্বাবলম্বী। তাদের কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক, কেউ মোটরসাইকেল মেকানিক হিসেবে পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে সমাজে কাজ করে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙন কবলিত যমুনা তীর ও চরগ্রামের নারীরা এখন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছে। তারা অটোরিকশা চালানোর পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও মোটর গাড়ি মেরামতের কাজ শিখছে। তারা এ প্রশিক্ষণ নিয়েছে বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলা সদর থেকে। সারিয়াকান্দির মা ফাতেমা (রা.) নারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সরকারিভাবে এ প্রশিক্ষণ দিতে নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রথম ব্যাচের আটজন নারী চাকরিও পেয়েছেন। আর অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সিএনজি অটোরিকশা কিনে চালাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নদী ভাঙন কবলিত এই অঞ্চলে কর্মহীন লোকের সংখ্যা কমাতে সরকারিভাবে ২০০০ সালে সারিয়াকান্দির যমুনা নদীর পাশে মা ফাতেমা (রা.) নারী প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়। প্রথম দিকে বিনা অর্থে সেলাই, হাতের কাজ, কুটির শিল্প ইত্যাদির প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। পরে যুক্ত হয় টেইলারিং ও অ্যাম্ব্রয়ডারির কাজ। বিগত ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ওই আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মো. আব্দুল মান্নানের উদ্যোগে তা পুনরায় চালু করা হয়।

এরপর ২০১৪ সাল থেকে সেখানে মেয়েদের শেখানো হচ্ছে ড্রাইভিং ও মোটরসাইকেল মেরামত কাজ। এই কেন্দ্র থেকে গত ১০ মাসে ৩ ব্যাচে ৪৭ জন প্রশিক্ষিত নারী বের হয়ে মাঠে নেমেছে। তিন মাস মেয়াদী এই কোর্সের চতুর্থ ব্যাচে আরো ২০ নারী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তারাও মাঠ পর্যায়ে মোটরযান চালিয়ে সফলতা দেখিয়েছে। প্রশিক্ষণে সহযোগিতা দিচ্ছে বেসরকারি সংস্থা ইউসেপ।

নারীদের থ্রি হুইলার চালনা দেখে যারা আগে সন্দেহ করছিল চালাতে পারবে কিনা তারাই এখন পুরুষ চালকের চেয়ে বেশি আস্থা পাচ্ছে নারী চালককে। সারিয়াকান্দি উপজেলা সদরের হানিফ, আবুল মুন্সির মতো বেশ কয়েকজন যাত্রী বললেন, নারী চালকরা খুব সাবধানে গাড়ি চালায়। এদের পাশে বসে চললে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ইন্সস্ট্রাকটর শামসুল তাব্রেজ বলেন, নারীকে কর্মক্ষম করে তুলতে বিভিন্ন ট্রেডের সঙ্গে সিএনজিচালিত থ্রি হুইলার মোটর ড্রাইভিং এবং মোটরসাইকেল সার্ভিস মেকানিক্স ট্রেড কোর্স চালু করা হয়। সাথে আবাসিক ব্যবস্থাও করা হয়। হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে যাতে গাফিলতি না হয় সে জন্য এই ব্যবস্থা।

সিএনজি অটোরিকশা ট্রেডের ইন্সস্ট্রাকটর শাহ আলম বলেন, মেয়েরা যখন অটোরিকশার স্টেয়ারিং হাতে নেয় তখন তাদের মধ্যে অন্য রকম একাগ্রতা ও ইচ্ছাশক্তি থাকে। এই শক্তিই তাদেররকে কাঙ্ক্ষিত পথে নিয়ে যায়। এ পর্যন্ত যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে বের হয়েছে তারা প্রত্যেকেই নিজেদের এলাকায় ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে বলে জানান তিনি।

কথা হয় সোনাতলার জোরগোছার জাহিদা সুলতানা, সারিয়াকান্দির সীমা আক্তার, শিবগঞ্জের সুফিয়া সুলতানার সাথে। তারা থ্রি হুইলার (টেম্পো স্কুটার অটোরিকশা) চালাতে পারে যে কোন সড়ক ও মহাসড়কে। একই সঙ্গে যান্ত্রিক যে কোন ত্রুটির কারণে অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেল বিকল হলে সেটি মেরামত করতে পারে।

সারিয়াকান্দি এলাকার কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, পুরুষ মেকানিকের চেয়ে নারী মেকানিক যত্নসহ তাদের বাইক মেরামত করে দেয় এবং সময়ও কম নেয়। এ কারণে তারা নারীদের কাছে বেশি যায়।

মা ফাতেমা (রা.) নারী প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র সূত্র জানায়, এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নারীরা এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে যে ইতিমধ্যে দেশের বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষিত নারীদের চাকরির অফার দিয়েছে। এর মধ্যে রানার গ্রুপ অন্যতম। তবে কয়েকজন নারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে মোটর গ্যারেজ প্রতিষ্ঠা করবে। এদের ব্যাংক ঋণ পেতে যাতে কোন অসুবিধা না হয় সে জন্য ব্যাংক এশিয়ার সাথে তাদের একটি চুক্তিও করা হয়েছে। প্রশিক্ষেণের সার্টিফিকেট দেখে খুব অল্প সুদে তারা প্রয়োজনীয় ঋণ সাহায্য দিবে।

এই কেন্দ্রে সরকারিভাবে ৫০ জনের থাকা-খাওয়া ও প্রতি প্রশিক্ষণার্থীর জন্য প্রতি মাসে ৩০০ টাকা করে প্রদান করা হয়। বিগত ২০১৪ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া মোটরসাইকেল সার্ভিস মেকানিক ব্যাচে ৩০ জন, সিএনজিচালিত থ্রি হুইলার চালানোর ব্যাচে ১৭ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণার্থী সাজেদা আক্তার জানান, মোটরসাইকেল মেরামত করার জন্য যা প্রয়োজন তাই শেখানো হচ্ছে। কাজটি শিখতে পারলে অন্য কোথাও ভালো চাকরি এবং নিজেরা সংসার চালিয়ে নিতে পারবেন।

সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশা এলাকার মরিয়ম খাতুন বলেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। অটোরিকশা চালানোর কৌশল, ট্রাফিকিং, ছোট ছোট কিছু সমস্যার বিষয়েও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এখন অটোরিকশা চালিয়ে নিজের সংসারের হাল ধরতে পারবো।

জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম জানান, নতুন শুরু হওয়া সিএনজি ও মোটরসাইকেল মেকানিক্স ট্রেডে মেয়েদের সাড়া অনেক বেশি। এ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে ৩৮ জন মেয়ে ব্যাংক ঋণের জন্য আবেদন করেছে। আরো কয়েকজনকে রানার গ্রুপ ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপে চাকরির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমাজের অভাবী নারীদের প্রশিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করে দেয়া।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ নেতাদের বহিষ্কার, ওবায়দুল বলছেন ‘অ‌্যাকশনের প্রমাণ’

ডেস্ক রিপোর্ট :: রাজধানীর গুলিস্তানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে চলা সংঘর্ষের সময়ে ঢাকা দক্ষিণ …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open