সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২০ : ৪:৫৪ পূর্বাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

সিলেট বাস টার্মিনালে নেই শৃঙ্খলা মাসে চাঁদাবাজি ১৫ লাখ টাকা

IMG_0899ডেস্ক রিপোর্ট :: বৃদ্ধ এক নারীর সাথে ১২ বছরের এক শিশু। বিয়ানীবাজার যাওয়া জন্য আসেন দক্ষিণ সুরমার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে। কিছু বলার আগেই তাঁকে টেনে তোলার চেষ্টা করা হয় বিশ্বনাথের বাসে। তিনি প্রথমে না বুঝেই বাসে ওঠেন। একটু পর হেলপার ‘বিশ্বনাথ বিশ্বনাথ’ বলে যখন যাত্রীদেরকে ডাকছেন; তখন তিনি বুঝলেন, গাড়িটি বিয়ানীবাজার নয়; বিশ্বনাথে যাবে। সঙ্গে থাকা শিশুটিকে নিয়ে বৃদ্ধা বাস থেকে নামলেন। নামার পর বিয়ানীবাজারের স্ট্যান্ডটি খোঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। না পাওয়ারই কথা; বাস টার্মিনালে কোন গন্তব্যের স্ট্যান্ড কোন স্থানে তা শিক্ষিতদেরও খোঁজে পেতে কষ্ট হয়। কারণ ১৬টি স্ট্যান্ডে ছোট-বড় ৫ হাজার গাড়ির মধ্যে কোনো গন্তব্যেরই নাম সংবলিত সাইনবোর্ড নেই টার্মিনালে। আর যাত্রীদেরকে টার্মিনালের ভেতরে গাড়িতে না উঠিয়ে চালকেরা রাস্তায় চলে আসেন বাস নিয়ে। শৃঙ্খলা না থাকায় বাস টার্মিনালে দিনভর থাকে যানজট। বাসের হেলপাররাও গাড়িতে যাত্রী ওঠাতে করেন টানাহ্যাঁচড়া।
সিলেটের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে প্রতি বছর ৬৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হলেও টার্মিনালটির অবস্থা খুবই নাজুক। ইজারাদাররা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) কাছ থেকে এক বছরের জন্য টামির্নাল ইজারা নিয়ে অবৈধভাবে নিজেদের পকেট ভারী করতে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইজারায় বাস টার্মিনালে কোনো ভাসমান দোকান বসানোর নিয়ম না থাকলেও বর্তমানে তিন শতাধিক টং দোকান টামির্নালের ভেতরে ও রাস্তার পাশে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫০ টাকা পর্যন্ত অবৈধভাবে চাঁদা উত্তোলন করেন ইজারাদাররা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল বাবদ নেওয়া হয় প্রতিদিন ৩০ টাকা। যা গড়ে মাসে ১৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ৩শ’ অবৈধ দোকানের কারণে বর্তমানে টার্মিনালে বাস-মিনিবাস রাখা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বাস মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের একাধিক নেতা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এক বছরের জন্য সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ইজারা দেয় সিসিক কর্তৃপক্ষ। এ থেকে সিলেট সিটি কর্পোরেশন পেয়েছে ৫৪ লাখ ২শ’ টাকা। আর সরকার ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পেয়েছে। মেয়াদ শেষ হলে নির্ধারিত তারিখে ফের ইজারা দেওয়া হবে বাস টার্মিনাল। তবে ইজারাদারদেরকে কোনো ভাসমান দোকান দিতে নির্দেশনা সিসিক কর্তৃপক্ষ দেয়নি। কিন্তু যারাই বাস টার্মিনাল ইজারা নেন, তারা ভাসমান দোকানকে পুঁজি করে চালিয়ে যান অবৈধ বাণিজ্য। বর্তমানে ৩শ’ দোকান থেকে ইজারাদাররা গড়ে প্রতিমাসে অবৈধ আয় করছেন ১২ লাখ টাকার উপরে। আর বিদ্যুৎ বিল বাবদ নিচ্ছেন মাসে ৩ লাখ টাকার অধিক। যা ১৫ লাখ টাকার উপরে বলে জানান মালিক ও শ্রমিক নেতারা। এ আয় থেকে সরকার ও সিসিক সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান সবুজ সিলেটকে বলেন, বাস টার্মিনালকে শৃঙ্খলায় আনতে হলে সিসিক, বাস মালিক, শ্রমিক ইউনিয়ন ও ইজারাদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। তবে আমরা জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য টার্মিনালের ভেতরে বিভিন্ন রাস্তা পাকাকরণ, পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থার উদ্যোগ নিচ্ছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের আগে গত ৩ বছর টার্মিনাল ইজারা যায়নি। ইজারাদারদের আয় ঠিকই হয়; কিন্তু তারা সিসিককে লোকসান দেখাতে চেষ্টা করেন। ইজারায় টার্মিনালে কোনো দোকান দেওয়ার নিয়ম নেই বলেও জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, প্রত্যেকটি স্ট্যান্ড আমরা পৃথকভাবে টার্মিনালের ভেতরে করে দিয়েছি। কিন্তু সবাই নিয়ম না মেনে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় এসে শৃঙ্খলা নষ্ট করেন। যানজট সৃষ্টি করেন। আমরা প্রত্যেক লাইনের গাড়ির জন্য আগামীতে ইজারা দেওয়ার আগে নির্দিষ্ট সাইনবোর্ড বসানোর চেষ্টা করব।
সিলেট জেলা পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্র জানায়, বাস টার্মিনালে বর্তমানে ১৬টি স্ট্যান্ড রয়েছে। ৩০টি কাছাকাছি রয়েছে কাউন্টার। সব মিলিয়ে বাস-মিনিবাস ও মাইক্রোবাসের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। ১৬ টি স্ট্যান্ডের মধ্যে সিলেট-জকিগঞ্জ, সিলেট-বিয়ানীবাজার মিনিবাস-মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড ২টি, সিলেট-বিশ্বনাথ, সিলেট-জগন্নাথপুর স্ট্যান্ড ৩টি, সিলেট-ঢাকাদক্ষিণ-ভাদেশ্বর স্ট্যান্ড ১টি, সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ স্ট্যান্ড ১টি, সিলেট-তামাবিল স্ট্যান্ড ১টি, সিলেট-মৌলভাবাজার, সিলেট-কুলাউড়া, সিলেট-হবিগঞ্জ এবং সিলেট-ঢাকা রোডের জন্য ১টি করে স্ট্যান্ড রয়েছে। সিলেট-ঢাকা মিতালি, সিলেট-ঢাকা সুরমা, সিলেট-ঢাকা এনা, সিলেট-ঢাকা হানিফ পরিবহণের একটি করে স্ট্যান্ড রয়েছে। সিলেট-ঢাকা বাসের মধ্যে এনা পরিবহণ, হানিফ, আলমোবারকা, গ্রীন লাইন, ইউনিক, সাগরিকা, নিউ লাইন, এমপি, মামুন, মিতালি পরিবহণসহ সব বাসেরই একাধিক কাউন্টার রয়েছে। এছাড়া, সিলেট-কুমিল্লা, সিলেট-ব্রাক্ষণবাড়িয়া, সিলেট-ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, যশোর, বরিশাল, খুলনা, টাঙ্গাইল ও বগুড়ার বাসের জন্য আলাদা কাউন্টার রয়েছে।
পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট বিভাগীয় সভাপতি, কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও জেলার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সেলিম আহমদ ফলিক বলেন, বাস টার্মিনালে এখন আগের মতো অপরাধ হয় না। তবে শৃঙ্খলা একেবারে নেই বললেই চলে। বাস রাখার জায়গা নেই। ইজারাদাররা ভাসমান টং দোকান দিয়ে টার্মিনাল জুড়ে রেখেছেন। টার্মিনালের ভেতরে অল্পবৃষ্টিতে হাঁটুপানি হয়ে যায়। বৃষ্টির দিনে এতে অনেক গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রী-চালক সবাইকে দুর্ভোগে পড়তে হয়। পানির জন্য নামাজে যাওয়া যায় না। তিনি বলেন, অবৈধ টং দোকান সরানোর জন্য আমরা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। আগামী ১ মাসের মধ্যে এসব অবৈধ দোকান না সরালে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব। টার্মিনালে এক বাসের যাত্রী অন্য বাসে উঠানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগটি সঠিক। শৃঙ্খলার অভাবে হেলপাররা অনেক সময় যাত্রীদেরকে গাড়িতে তোলার সময় এমনটি করেন। হেলপাররা না বুঝেই করেন। আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদেরকে বলি, যাত্রীদের সাথে ভালো আচরণ করার জন্য। তিনি বলেন, আমরা শীঘ্রই টার্মিনালের বিভিন্ন স্ট্যান্ডের সামনে সাইনবোর্ড বসাব। এতে যাত্রীরা নির্দিষ্ট স্থানের বাস খোঁজে পেতে সমস্যায় পড়বেন না।
মালিক শ্রমিক ইউনিয়নের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, প্রতি মাসে বাস টার্মিনালের দোকান থেকে ১২ লাখ টাকার উপরে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। আর বিদ্যুৎ বিলের নামে আরো প্রায় ৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এটি নিয়মবহির্ভূত।
অপরদিকে, বিভাগীয় শহর সিলেটের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে যাত্রী সাধারণের নেই পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা। যাত্রীদের সুবিধাকল্পে টার্মিনালের অভ্যন্তরে তিনটি শেড নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিন যাবৎ এগুলো চালু না করায় বর্তমানে তা পরিত্যক্ত হিসেবে পড়ে আছে। শেড তিনটি মাদকসেবী ও ভাসমান পতিতাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। আর অনেক চালক রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করান। নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কাই করা হয় না টার্মিনালে। টার্মিনাল এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠেছে একর পর এক বাস কাউন্টার। ২/১টি ব্যতীত প্রায় সব কাউন্টারে যাত্রীসেবার ন্যূনতম সুবিধা নেই। বাস কাউন্টারের নিজস্ব কোনো পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় বাসগুলো রাস্তার উপরে পার্কিং করে রাখা হয় বেশিরভাগ সময়। এর ফলে প্রায়ই টার্মিনাল এলাকায় যানজট লেগে থাকে। সিলেট সিটি কর্পোরেশন প্রতি বছর অর্ধ কোটি টাকার উপরে রাজস্ব আদায় করলেও টার্মিনালে তেমন কোনো উন্নয়ন করা হয়নি। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন কয়েকশ’ দূরপাল্লার বাস আসা-যাওয়া করে।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

সেই রাবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ

আত্মহত্যা’ করা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলির সাবেক …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open