শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২০ : ২:৫০ পূর্বাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

নাটক মুল্লুক : অচলায়তন ভাঙার উপাখ্যান

1_100252_0বিনোদন ডেস্ক: রাতের গভীরে যত অন্ধকার তারও বেশি নিকষ-কালো রূপ এই পৌষের রাতের। এমনি রাতে চা বাগানির নিঃসঙ্গ এক অশীতিপর বৃদ্ধার লড়াই মৃত্যুর সঙ্গে। কত বয়স তার, সত্তর-আশি কিংবা শতক, নাকি তারও বেশি! অথবা আমরা ধরে নিই প্রতœবয়সী এই নারী শেকড় ছিন্ন কতিপয় মানুষের সময়-সাক্ষী। মৃত্যুপূর্ব গোঙানি শেষে যেন সে নিস্তেজ। যখন বৃদ্ধার গোঙানি থামে, দীর্ঘ কয়েক দিনের গোঙানিতে অভ্যস্ত হওয়া অন্য বাগানিরা মাটির খোঁড়ল ঘর থেকে বেরিয়ে আসে মাটি খেয়ে বেঁচে থাকা ঘুগরা পোকার মতো। কিন্তু তারা নিশ্চিত হতে পারে না যে, বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। সেই রাতে দৈবালোকের মতো বৃদ্ধার সামনে দৃশ্যমান হতে থাকে তার খ- খ- অতীত। বৃদ্ধকালকে বয়ে বেড়ায় বৃদ্ধার বর্তমান সময়ের মধ্যে।
১৯২১ সালে চা শ্রমিকদের ‘মুল্লুক চল’ আন্দোলন, দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া দেশ পাকিস্তান এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্র বাংলাদেশে একই দাসত্বের বৃত্তে বন্দি থাকা মানুষের কথাই এই নাটকের উপজীব্য বিষয়। এক বৃদ্ধাকে দিয়ে নাটকের শুরু এবং শেষ। যে বৃদ্ধার বয়স একটি জনগোষ্ঠীর দাসত্বকালীন সময়। হতে পারে তার বয়স দুই শ বছরের বেশি বা কম। অবাস্তব বিষয়টিকে অন্য বাস্তবতায় ফেলে যৌক্তিকতা খোঁজার চেষ্টা এই নাটকে। বাঙালি জাতীয়তাবোধের সঙ্গে মিশে আছে শাসক শ্রেণির দীর্ঘকালের শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার ইতিহাস। যে অচলায়তন বারবার ভেঙেছে বাঙালি, সেই শোষকের ভূমিকায় নিজেদের প্রতিস্থাপন করবে না তারা। যুগ যুগ ধরে সারা মানবজাতি মূল্যবোধের অভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। বর্তমান সময়ে মানবিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় চারদিকে লক্ষ করা যাচ্ছে তা ভয়াবহ। সুন্দর ও মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ছাড়া কোনো সমাজ এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে পারে না।
একটি চা বাগানের শ্রমিকদের বঞ্চনা ও দাসত্বের কাহিনি এই নাটকের মূল উপজীব্য। মানবিক মূল্যবোধের অভাবে একদল মানুষ কীভাবে আরেক দল মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালায় তা উঠে এসেছে এই নাটকে। নাট্যকার ও নির্দেশক বাকার বকুলের সঙ্গে প্রদর্শনী শেষে নাটকের নির্মাণ ও পটভূমি নিয়ে আলাপকালে বলেন, ‘সংলাপ থেকে শুরু করে দৃশ্য নির্মাণের কর্মশালা হয়েছে প্রতিদিন মহড়া কক্ষে। কর্মশালার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হওয়া বিচ্ছিন্ন কতগুলো দৃশ্য সংযোজনই নাটকের গল্প। সে কারণে গল্পের ধারাবাহিকতা কিংবা দ্বান্দ্বিক নাট্য মুহূর্ত নির্মাণ আমাদের উদ্দেশ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। যদিও গল্পের বীজ-ভাবনাটি দীর্ঘদিন চিন্তায় ঘুরপাক খেয়েছে।’
শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে ৬৪টি জেলায় মূল্যবোধের নাট্য নির্মাণ কর্মসূচির আওতায় একাডেমির মহাপরিচালক নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকীর ভাবনা ও বাকার বকুলের রচনা ও নির্দেশনায় ঢাকা জেলার প্রযোজনায় নাটকটি মঞ্চায়িত হয়। ‘মুল্লুক’ নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঢাকার কিছু স্বনামধন্য থিয়েটারের নাট্যকর্মী। থিয়েটার বাতিঘর, প্রাচ্যনাট, লোকনাট্যদল, দেশনাটক, তীরন্দাজ আর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কিছু চৌকস নাট্যকর্মী নিয়ে বাকার বকুল এই নাটকটি নির্মাণ করছেন। ‘মুল্লুক’ নাটকের কুশীলবরা হলেন শশাংক শাহা, রুনা কাঞ্চন, সোহেল ম-ল, নায়িমী নাফসীন, রবিউল ইসলাম, ইন্দ্রানী ঘটক, তানবীর লিমন, মেবিন হাসান, শারমীন আক্তার, শফিকুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, সোহেল রানা, হাফিজা আক্তার ঝুমা, শামীম শেখ, আকাশ সরকার ও শান স্বপন।
নাটক ‘মুল্লুক’র মঞ্চ নির্মাণে ছিলেন আলি আহমেদ মুকুল ও ব্যবস্থাপনায় ছিলেন শশাংক সাহা। সংগীত করেছেন রবিউল ইসলাম শশী এবং আলোতে আসলাম অরণ্য। কস্টিউম ও প্রপস তৈরিতে উনা কাঞ্চন মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। পুরো নাটকে অসামান্য কোরিওগ্রাফি মন ছুঁয়ে গিয়েছিল আগত দর্শকদের, যেটি স্নাতা শাহরিন করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। আর তার সঙ্গে সহযোগিতায় ছিলেন নজরুল ইসলাম। মূল্যবোধের নাটক ‘মুল্লুক’র প্রযোজনা উপদেষ্টা ছিলেন লিয়াকত আলী লাকী। নিঃসন্দেহে বলা যায়, সবাই খুব ভালো অভিনয় করেছেন, যার যার মতো উজাড় করে দিয়েছেন। তবে মিলন দৃশ্যটিতে হঠাৎ পাপেট ব্যবহার, একটু বেশি আরোপিত বা এলিয়েন মনে হয়েছে, এসবের দরকার ছিল না। এসব চমকের লোভ সামলাতে হবে। আমরা মঞ্চে মিলন দৃশ্য করতে কেমন যেন জড়তায় পড়ে যাই, জড়তা কাটাতে হবে, নিজেদের মতো গুরুত্ব দিয়ে মিলন দৃশ্য নির্মাণ করা প্রয়োজন।
পোশাক, সেটে খুব চেনা নাটকের টেক্সচার চোখে বাধে। একটু সাবধান হতে হবে। লাইট নিয়ে আরেকটু ভাবনা দাবি রাখে। মিউজিক তৈরি এবং এর প্রয়োগ এক কথায় অসাধারণ হয়েছে! সবশেষে নির্দেশক বাকার বকুলকে ধন্যবাদ নতুন নাটক নির্মাণের জন্য। এই ধারা অব্যাহত থাকুক। চমকের লোভে তা যেন বিলীন না হয়। সব জাতি বৈচিত্র্যের মানুষ সহজাত অধিকার নিয়ে সহাবস্থান করবে এমন যোগ্য দেশ নির্মাণের মূল্যবোধ জাগ্রত থাকুক বাঙালির চেতনায়। জয়তু নাট্যপাগল তরুণ প্রাণ।- সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

আয়নাবাজি মুক্তি পাচ্ছে কানাডা-অস্ট্রেলিয়ায়

বিনোদন ডেস্ক ; অমিতাভ রেজা চৌধুরীর আলোচিত চলচ্চিত্র ‘আয়নাবাজি’ বাংলাদেশে মুক্তি পায় গেল ৩০ সেপ্টেম্বর। …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open