বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২০ : ৮:০৪ পূর্বাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

শাবিতে অধ্যাপকের গাড়িচাপায় ছাতক কলেজের শিক্ষকসহ নিহত ২

SUST-car-accidentশাবি প্রতিনিধি: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় প্রবেশপথ এক কিলোমিটার সড়কে শিক্ষকের প্রাইভেটকার চাপায় ছাতক ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক ও তাঁর মামা নিহত হয়েছেন। নিহত শিক্ষক আতাউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে দেখতে তাঁর স্কুল পড়–য়া মেয়ে রাহিবা রহমান (১৪) ও মামা গিয়াস উদ্দিনকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। এঘটনায় মেয়ে রাহিবাসহ আরও তিনজন আহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কিলোমিটার সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ড. আরিফুল ইসলাম ড্রাইভিং শেখার জন্য প্রাইভেটকার চালক আবুল কালামকে নিয়ে সকালে বের হন। দুপুর ১২টার দিকে ক্যাম্পাসের প্রবেশপথে আরিফুল ইসলাম নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিন পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে একটি গাছের সঙ্গে গিয়ে গাড়িটি ধাক্কা খায়। এতে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত হন। আহত হন আরও চারজন। আহতদের সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানে আরেকজনের মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন, সুনামগঞ্জের ছাতক ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক শেখ আতাউর রহমান (৫৫) ও তার মামা মো. গিয়াস উদ্দিনের (৬০)। নিহত দু’জনের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কাইট্টা গ্রামে। নিহত কলেজ শিক্ষকের ৮ম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে নগরীর দ্বীপ শিখা স্কুলের ছাত্রী রাহিবা রহমানও (১৪) আহত হয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়া ড্রাইভিং সিটে বসা শাবিপ্রবির শিল্প ও উৎপাদন প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম ও তার সহযোগী গাড়ির ড্রাইভার আবুল কালাম আযাদও আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে আহতদের অবস্থা শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এলাকাবাসীদের একজন শহরতলীর বড়গুল এলাকার আব্দুল আলিম। তিনি জানান, ‘গাড়িটি কিলোমিটার সড়ক’ ধরে খুবই দ্রুতগতিতে আসছিলো। কিছু বুঝার আগেই গাড়িটি এসে রাস্তার পাশে থাকা তিনজনকে ধাক্কা দেয়। গাড়িটি তাদের একসাথে টেনে নিয়ে রাস্তার পাশে গাছের সাথে সজোরে ধাক্কা দেয়। এসময় ঘটনাস্থলেই গিয়াস উদ্দিনের মৃত্যু হয়। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম। গাড়িটি গাছে আঘাত করার পরেই ডাইভিং সিট থেকে অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম নেমে এসে গাড়িটি টেনে হিচড়ে পাশে সরানোর চেষ্টা করেন। আর গাড়ির ভেতরে থাকা অপরজন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কাতরাচ্ছিলেন।’
প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল আলিম আরো বলেন, ‘আমি পাশ দিয়ে মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলাম। আশপাশের আর কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে চাইলো না। তাই আমিই আহতদের নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। এছাড়া আর কিছুই করার ছিল না আমার একার পক্ষে।’
আহত গাড়িচালক আবুল কালাম আযাদকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পর্যন্ত চালকের আসনে আমি নিজেই ছিলাম। কিন্তু সদ্য গাড়িটি কেনা স্যার (অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম) আমাকে চালকের আসন ছেড়ে দিতে বলেন। তিনি ক্যাম্পাসের রাস্তাটুকু চালিয়ে যাবেন বলে জানান। তাই আমি পাশে বসা ছিলাম আর উনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি গাড়িটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং এরপর আর কিছুই আমার মনে নেই।’ ওই শিক্ষক সবেমাত্র গাড়ি চালানো শিখছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন গাড়িচালক আবুল কালাম আযাদ।
এদিকে জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা শাবিপ্রবি ক্যাম্পাস এ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
নিহতদের মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে এবং দুর্ঘটনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারি কমিশনার (এসি) কামরুল ইসলাম। এক প্রশ্নের জবাবে এসি কামরুল বলেন, ‘যতটুকু জানি ওনার (অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম) কোনো ডাইভিং লাইসেন্স নাই। উনি মাত্র গাড়ি চালানো শিখছিলেন।’
এ ব্যাপারে নগরীর জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন জানান, নিহতদের মরদেহ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্ত শেষে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে শাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, দূর্ঘটনার খবর শুনে আমি ঘটনাস্থলে যাই এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। নিহতদের বিষয়গুলো থানা পুলিশ দেখছে বলে জানান তিনি। তবে রাত ৮টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আনুষ্টানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প ও উৎপাদন প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক ও সদ্য খোলা বিভাগ যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম মাত্র কয়েকদিন আগেই গাড়িটি কিনেন। গাড়ির নম্বর ঢাকা মেট্রে ২০-৪০০৯।
গতকাল শনিবার বেলা ১২টায় গাড়িচালক আবুল কালামকে সাথে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখ ‘এক কিলো রোড’-এ ড্রাইভিং শিখতে যান। এ সময়ই তার গাড়িচাপায় দু’জন নিহত ও তিনজন আহত হন।
এদিকে এই বিষয়টি নিয়ে শাবিতে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। ক্যাম্পাসের অন্যতম ব্যস্ত জায়গা এই এক কিলোসড়ক। শিক্ষার্থীদের আনন্দ, আড্ডা আর উল্লাসের জন্য অন্যতম পছন্দের জায়গা সড়কটি। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই এই সড়কে দল বেঁধে হেটে যাতায়াত করে। শুধু শাবি শিক্ষার্থীরাই নয়, বাহির থেকে আসা দর্শনার্থীদেরও এক অনন্য আকষণন এই কিলোসড়ক। সবাই দলবেঁধে কিলোরোড ধরে হেটে যেতে আর পাশের দুইদিকে লেকের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে ভালোবাসে। কিলোরোডে যেকোন প্রকার যানবাহনের জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারন করে দেওয়া ১৫ কিমি/ঘন্টা। এরকম একটা ব্যস্ত জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কর্তৃক গাড়ি চালনা শিখার মত দুঃসাহস করায় হতবাক বিশ^বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী।
সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে দুর্ঘটনার পর থেকেই শাবি নশিক্ষার্থীরা তাদের খহোভ জানিয়ে আসছেন, সাবেক শাবি ছাত্র জাহাঙ্গীর আলম নোমান লিখেন, ‘নতুন ডিপার্টমেন্ট, নতুন হেডশিপ সাথে নতুন গাড়ি, নতুন গাড়িতে নতুন ড্রাইভিং! এত সোনায় সোহাগা। তবে স্যারের নতুন ড্রাইভিং শেখার খায়েশ মেটাতে গিয়ে মারা গেলেন এক পরিবারের অভিভাবক ও তার ভাতিজা আরেকজন শিক্ষক। ছাতক ডিগ্রি কলেজের লেকচারার ও জগন্নাথপুরের বৃদ্ধ দুজনেই গাড়িচাপায় মারা গেছেন। হয়ত তারা সাস্টে ঘুরতে এসেছিলেন।’
শাবি শিক্ষার্থী এমবিএ ২য় সেমিস্টারের ছাত্র সুদীপ্ত বিশ্বাস ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘আরিফ স্যার ভালো মানুষ, সাদাসিধে মানুষ। শিক্ষক হিসেবে তিনি সর্বজনশ্রদ্ধেয়। কিন্তু স্যারের অর্বাচীনতা এবং অপরিণামদর্শীতার কারণে নিভে গেল দুটি প্রাণ। গাড়ি চালনায় শিক্ষানবিশ, সম্পূর্ণ আনাড়ি আরিফ স্যার কোন বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাড়ি ড্রাইভ করতে গেল তা আমাদের কারুরই বোধগম্য নয়।
বার বার দাবি ওঠা সত্বেও প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাড়ি চলাচল নিয়ে কোন সুর্নিদিষ্ট বিধিবিধান প্রণয়ন করেনি। যত নিয়ম কেবল রিকশা আর টমটমের জন্য প্রযোজ্য। এর আগে ক্যাম্পাসের এক কি:মি রাস্তায় বহিরাগত বখাটেদের মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন কেমিক্যাল বিভাগের একজন শিক্ষক।
সুদীপ্ত বিশ্বাস আরও লেখেন, যে দুটো জীবন ঝরে গেল তার পেছনে যদি আরিফ স্যারের দায় থাকে তাহলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হোক। যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায় করা হোক স্যারের কাছ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমি বিশ্ববিদ্যালয় অনুভুতিগ্রস্ত নই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারা গেলে ভাঙচুর করে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক বন্ধ করে দেবো আর খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের আনাড়িপনায় দুটো প্রাণ ঝরে গেলেও চুপ করে থাকবো সেই পাবলিক আমি নই। এই অপরাধ যদি আমার বাপ করতো তখনো আমি একই কথা বলতাম’।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

বিশ্বনাথে ধর্ষণের অভিযোগে ইউপি মেম্বার গ্রেফতার

সিলেটের বিশ্বনাথে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীকে ধর্ষণ করার অভিযোগে উপজেলার দৌলতপুর ইউপির ১নং ওয়ার্ডে মেম্বার …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open