রবিবার, ডিসেম্বর ৮, ২০১৯ : ৭:৪৮ অপরাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

রাজধানীতে ৬ শতাধিক তরুণী দেহ বাণিজ্যের বেড়াজালে(ভিডিও সহ)

sex-worker-400x221রাজধানীতে দেহ ব্যবসা থামছে না। দেহ ব্যবসা অবাধে চলছে। প্রশাসন এসব জেনেও না জানার ভান করছে। মাঝে মধ্যে পুলিশের অভিযানে দেহ ব্যবসায়ীরা আটক হলেও আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর গত পাঁচ বছরে খোদ রাজধানী থেকেই ১৭০০ কিশোরী-তরুণী উধাও হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব তরুণী ভাগ্যান্বেষণে ঢাকায় এসেছিল। পরবর্তীতে পরিবার-পরিজন বহু খোঁজাখুঁজি করেও তাদের আর সন্ধান পাচ্ছেন না। এ ব্যাপারে তাদের অভিভাবকরা বিভিন্ন সময় থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি করেই গ্রামে ফিরে গেছেন। অভাবী পরিবারের এসব অভিভাবক ঢাকায় অবস্থান নিয়ে স্বজনদের খোঁজাখুঁজি পর্যন্ত করতে পারছেন না। অন্যদিকে থানা পুলিশও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জিডি লিপিবদ্ধ করার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছেন। ‘নিখোঁজ জিডি’ নিয়ে পরবর্তীতে পুলিশ আর কোনো খোঁজখবর নেওয়ারও সময় পাচ্ছে না। ফলে উধাও হওয়া কিশোরী-তরুণীদের বড় অংশই আর উদ্ধার হয়নি। রহস্যজনকভাবে উধাও হওয়া এসব তরুণীর শেষ ঠিকানা কোথায়? কেমন আছেন তারা? এ ব্যাপারে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী। রাজধানীতে উধাও হওয়া কিশোরী-তরুণীদের বড় অংশই আটকে পড়েছে দেহবাণিজ্যের বেড়াজালে। অনেকেই আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউসের বাসিন্দা হতে বাধ্য হয়েছেন, বাকিদের ঠাঁই হয়েছে বিভিন্ন বাসাবাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টের আবদ্ধ ফ্ল্যাটে। আরেকটি অংশ পাচারের শিকার হচ্ছে। জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে তিলোত্তমা ঢাকায় পা রেখেই প্রতারকের প্রেম ছলনায় সব হারিয়েছে মমতাজ, শিউলি, রেজিয়া, বীনা, মুন্নীসহ কয়েকজন।
বস্তির স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাসের মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবনও ক্লেদাক্ত হয়ে গেছে। তিন-চার বছরেই একেকজন চার-পাঁচটি স্বামী বদল করেছেন ঠিকই, কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি তাদের। বরং রাজপথেই শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুড়িগ্রামের মেয়ে রিতু, গাইবান্ধার সীমা, সাতক্ষীরার সুলতানাসহ অনেকেই গার্মেন্ট কর্মী হওয়ার আশা নিয়ে রাজধানীতে হাজির হয়েছিলেন। অপরিচিত নারীদের আপনজন ভেবে আশ্রয় নিয়েই চাকরি খুঁজতে থাকেন তারা। কিন্তু চাকরি তাদের জোটেনি, পা পড়েছে অন্ধকার জগতে।নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সীমা আর রিতু এখন গৃহপরিচারিকার কাজ করে জীবন চালাচ্ছেন। তবে সুলতানা জড়িয়ে গেছেন মাদক ব্যবসায়। তিনিই এখন বাড্ডার বালুরমাঠ এলাকায় ইয়াবা ও ফেনসিডিল ব্যবসার নিয়ন্ত্রক। গুলশান, বনানী ও বাড্ডা এলাকার অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টের বিভিন্ন ফ্ল্যাটের মধ্যেও বন্দী রয়েছেন অনেকে। মাসের পর মাস তারা ফ্ল্যাটের বাইরে বেরুতে পর্যন্ত পারেন না। রামপুরা থানার বনশ্রী এলাকায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক তরুণী-যুবতী আটকে আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানকার আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে জিম্মি আছে অনেক ‘নিখোঁজ’ কিশোরী-তরুণী। ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে প্রতি বছর নিখোঁজ হওয়া শত শত নারী, শিশু ও কিশোরীর একটি অংশ বিদেশে পাচার হয় এবং বাকিরা খুন, ধর্ষণসহ নানা বর্বরতার শিকার হয়।
২০১২ সালে প্রায় সাড়ে ৫০০ নারী, শিশু ও কিশোরী লাপাত্তা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ জন, সেফ হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে। পুলিশের রেকর্ডে বাকিদের নিখোঁজ দেখানো হয়েছে। তেজগাঁও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের উপ-পুলিশ কমিশনার জানান, গত বছর রাজধানীতে নিখোঁজ হওয়া শিশু-কিশোরীদের মধ্য থেকে প্রায় আড়াইশজনকে নিয়ে সংস্থাটি কাজ করেছে। এদের মধ্যে অনেকে হত্যা-ধর্ষণের শিকার হয়।
গত বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত অন্তত ২৩ জন শিশু-কিশোরীকে উদ্ধার করে সেন্টারে রাখা হয়, পরবর্তীতে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে রাজধানী থেকে সাড়ে ৯ শতাধিক শিশু, কিশোরী, যুবতী উধাও হয়। এর মধ্যে ৫২ জনকে দৌলতদিয়া পতিতালয় থেকে উদ্ধার করা হয়। আরও ৩৩ জন নানা রকম নির্যাতনের শিকার হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার হন। পরে হাসপাতাল, থানা, আদালতের ধকল শেষে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরতে সক্ষম হন। আবাসিক হোটেলে বন্দীদশায়: জানা যায়, উধাও হওয়া কিশোরী-তরুণীদের মধ্য থেকে বড় একটি অংশ আবাসিক হোটেল ও ফ্ল্যাট-বাড়িতে জিম্মিদশায় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। বনানী থানার এয়ারপোর্ট রোড ঘেঁষা ১৬টি আবাসিক হোটেলে দেহবাণিজ্যে আটকে আছেন ছয় শতাধিক তরুণী। অবশ্য হোটেল ও গেস্ট হাউস মালিকদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা জানান, কাউকে জিম্মি করে দেহবাণিজ্য চালানোর প্রশ্নই ওঠে না। বেশির ভাগই প্রতারণার কবলে সর্বস্ব হারিয়ে উপায়ান্তরহীন অবস্থায় হোটেলে-গেস্ট হাউসে স্বেচ্ছায় নিজেদের লুকিয়ে রাখছে। হোটেলগুলোতে কথিত ‘উপায়ান্তরহীন নারীদের’ দেহবাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন তাজু নামে জনৈক ব্যক্তি। রাজধানীতে নারীবাণিজ্যের গডফাদার হিসেবে পরিচিত রাজিব বাবুর ম্যানেজার রবি ও তাজু এখন নিজেই এ বাণিজ্যের সর্বেসর্বা। গুলশান-বনানীর ৯টি আবাসিক হোটেল দেখভাল করেন তিনি। বনানীর কয়েকটি রেস্ট হাউসে নারীবাণিজ্য চলে জনৈক শামীম ও (ড্রাইভার) রফিকের নেতৃত্বে। হোটেলের খাতায় কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নামে দৈনিক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বখড়া দেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। আরও ১১ জন ছিঁচকে মাস্তান-সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজের নাম আছে পেমেন্টের তালিকায়। তবে পুলিশের নামে ‘বখড়া’ দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ বলেন, কোনো অভিযোগ পাওয়ামাত্র হোটেলগুলোতে অভিযান চালানো হয়। তবে গত তিন মাসেও আবাসিক হোটেলে অভিযান চালানো, দেহপসারিণী বা খদ্দের গ্রেফতার সংক্রান্ত কোনো রেকর্ড থানায় পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, গ্রেফতারকৃত পতিতা ও খদ্দেরদের ডিএমপি অ্যাক্টে কোর্টে চালান দেওয়া হয়েছে, তাই থানার রেকর্ডে দেহপসারিণী বা খদ্দের হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। রবির চেয়েও ডাকসাইটে গডফাদার হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন গাজীপুর কাপাসিয়ার জনৈক তাজুল ইসলাম ওরফে তাজু। বারিধারা, গুলশান,উত্তরা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক ডজনেরও বেশি ফ্ল্যাটে অসামাজিক কার্যকলাপের বাণিজ্য চলে তার। শাহবাগ থানার বঙ্গবাজার এলাকার একটি হোটেলের নারীবাণিজ্য কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। হোটেলটি পরিচালনায় সম্পৃক্ত নূরুল ইসলাম কামাল হোসেন ও তাজউদ্দিন তাজুর বিরুদ্ধে দেহবাণিজ্য, মানব পাচার ও নীতিহীন আইনে এক ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে। অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, দেহকে পুঁজি করে গড়ে তোলা বাণিজ্য আবাসিক হোটেল, মোটেল, গেস্ট হাউসেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে বাসাবাড়ি, ফ্ল্যাটগুলোতে। এখান থেকেই নানা অপরাধের সূত্রপাত ঘটার নজির রয়েছে। ২০১০-১১ সালে র‌্যাবের তৎপরতায় রাজধানীর বেশির ভাগ আবাসিক হোটেলের দেহব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ‘দেহবাণিজ্যনির্ভর’ ২৬টি হোটেল তালাবদ্ধ করে সিলগালা করেন। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতাবলে আবার হোটেলগুলো চালু করেছেন মালিকরা। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন হোটেল ও গেস্ট হাউসে অপরাধ পরিস্থিতি এবং নারী পাচারের স্বরূপ উদঘাটনের নিমিত্তে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড হেলথ ফাউন্ডেশন নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন। সংস্থার মহাসচিব আলমগীর সেলিম জানান, থানা-পুলিশের অবৈধ আয়ের বড় অংশই পূরণ হয় দেহবাণিজ্যের খাত থেকে। অধিকাংশ থানায় এসব বখড়া আদায়ে একজন এএসআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।
গুলশান থানাধীন কাকলী (বনানী) এলাকার একটি অভিজাত আবাসিক হোটেল। সাধারণ খদ্দের বেশে পাঁচ তলার হলরুমে পৌঁছানো সম্ভব হয়। সেখানে চারটি সোফা ও ১০-১২টি চেয়ারে বসেছিলেন বিভিন্ন বয়সের ২০-২২ জন নারী। হোটেল কর্মচারী রুম বয়দের সঙ্গী হয়ে খদ্দেররা ঢুকেই কাউকে পছন্দ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ততক্ষণে প্রতিবেদকের গোপন ভিডিও ক্যামেরায় অপরাধ কর্মকান্ডের বিস্তৃত চিত্র ফুটে ওঠে। একই দিন রাত পৌনে ৮টায় যাওয়া হয় কারওয়ানবাজার এলাকায়। তেজতুরী বাজার ১ নং রেলগেট সংলগ্ন আরেকটি অভিজাত আবাসিক হোটেল। সেখানে দেহবাণিজ্যের এমন চিত্র পর্যবেক্ষণ করা গেছে, যা ভিডিওচিত্রে দেখলে যে কেউ শিউরে উঠবেন। নারীবাণিজ্যের চক্রে রবি, মামুন, জৈদিস বাবুল, কালাম, সিলেইট্টা পিচ্চি রুবেল, খাটা মাসুদ, সালমা, শাহিন, শুভ, নুরুল ইসলাম, সেন্টু হাসান, তৌহিদ, সবুজ, টাক্কু সাগর, সোমা, রহিম মিয়া, নিলু, সবুজ, নাজমা, আউয়াল, মিঠুন ম-ল, রনি, কচি, খোরশেদ, ইউনুস, চুন্নু খাঁ, রীপা, শহীদ, ডিবি পরিচয়দানকারী রিংকু, রহমত আলী, বিউটি, মোহর আলী গাজীর জামাই হাফিজুল, সাইদা, শামীমা, গোলাম হারুন, আলাউদ্দীন ঝিলুসহ রয়েছে অসংখ্য সক্রিয় সদস্য। দালাল হিসেবে বেশি পরিচিত হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রশিদ, গাজীপুরের সোহেল, শরীয়তপুরের আ্গুরী, চাঁদপুরের জামাল উদ্দিন, বরিশালের লিটন, নজরুল, সবুজসহ শতাধিক সদস্য। অনেকেই ভিজিটিং কার্ড পর্যন্ত বানিয়ে খদ্দেরের হাতে দিয়ে থাকে।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

সেই রাবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ

আত্মহত্যা’ করা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলির সাবেক …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open