বুধবার, নভেম্বর ২৫, ২০২০ : ১১:০২ পূর্বাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

হযরত শাহ্জালাল বিমানবন্দর এলাকায় নানা অপ্রীতিকর ঘটনা -প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চলে লুটপাট

রাজধানীর হযরত শাহ্জালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে মালামাল রাখার পর থেকেই শুরু হয় সিন্ডিকেট সদস্যদের দৌরাত্ম্য। চুরি, লুটপাট, মালামালের ওপর ভিত্তি করে ঘুষের পরিমাণ নির্ধারণ, চাঁদা দাবি ও ব্যবসায়ীদের জিম্মিসহ মাস্তান-সন্ত্রাসীদের সীমাহীন উত্পাত চলে সেখানে। মালামাল খালাস করতে হলে পর্যবেক্ষণসহ সব দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে বিমানবন্দরের কাস্টমস বিভাগ। প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলে লুটপাট। বিমানবন্দরে বিভিন্ন প্রশাসন ও গোয়েন্দা বাহিনীসহ ১৮টি সংস্থার সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকলেও তাদের উপস্থিতিতেই এসব চলে।

এ নিয়ে হযরত শাহ্জালাল বিমানবন্দর এলাকায় নানা অপ্রীতিকর ঘটনা আর সংঘাত-সংঘর্ষ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কার্গো ভিলেজ, কাস্টম হাউস, ক্যান্টিন, কার পার্কিং, রেন্ট-এ-কার, সিভিল অ্যাভিয়েশন ও বিমান অফিসের সব টেন্ডার কার্যক্রম, বিমানবন্দরে প্রবেশমুখের ফুটপাতসহ প্রতিটি পয়েন্টে চাঁদাবাজি, জবর দখল ও লুটপাটসহ একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে গজিয়ে উঠেছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ।নিয়ন্ত্রকরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পরিচয়ধারী। তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ম্যানেজ করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
মালামাল বের করতে কখনও সমঝোতার ভিত্তিতে কিংবা কখনও আমদানি করা মালামালের প্রকৃত মালিককে অপহরণ করে মালামাল ছাড় করিয়ে তা নিজেদের কব্জায় নিয়ে যায় এই চক্র।
এসব উপায়ে মালামাল হস্তগত করা সম্ভব না হলে চেনাজানা মুখের সন্ত্রাসীরা সরাসরি দুর্বৃত্তপনায় মাঠে নামে। সশস্ত্র অবস্থায় তারা হুমকি-ধমকি দিয়ে কার্গো ভিলেজ এলাকায় ঢুকে পড়ে। তারা নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর হামলা চালায়, মারধর করে।

এ সময় কার্গো ভিলেজে রক্ষিত কোটি কোটি টাকার পণ্যসামগ্রী লুটে নেয় তারা। প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানতে পেরেছেন।
সম্প্রতি বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এমন ঘটনাই ঘটেছে। চক্রের একাংশ বদরুল আলম শ্যামলসহ সাতজন গ্রেফতার হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে র্যাব ও পুলিশ। এমনকি গোডাউন থেকে মালামাল বের করতে যে পরিমাণ ঘুষ দিতে হয় প্রশাসনকে তারও একাধিক তালিকা পেয়েছে র্যাব।
এই তালিকায় কাস্টমসের সহকারী কমিশনার থেকে শুরু করে বিমানের লোডার ও গোডাউনের গেটম্যানসহ পিয়ন-ঝাড়ুদারেরও নাম রয়েছে। একটি তালিকায় দেখা গেছে, শ্যামল গত ২ জুলাই একটি চালানে মালামাল বের করতে কাস্টমস টিমের মোট ১৩ জনকে ঘুষ হিসেবে ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা দিয়েছে। এর মধ্যে কাস্টমসের একজন সহকারী কমিশনারকে দিতে হয়েছে ৫৫ হাজার টাকা, কুরিয়ার গেটে ৫০ হাজার, ইমান আলী নামে একজনকে দিতে হয়েছে ৩ হাজার, রাজস্ব কর্মকর্তাকে ১০ হাজার, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে ৭ হাজার, সফিককে ৭ হাজার, মাহাবুবকে ৫ হাজার, মোজাম্মেলকে ১০ হাজার, আরেফিনকে ৫ হাজার, এসিপি এসআই ১ হাজার ও সুপার আজমকে ৫শ’ টাকা।

এছাড়াও একই চালানে শুল্ক গোয়েন্দা টিমের পাঁচজনকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন শ্যামল। এর মধ্যে শুল্ক গোয়েন্দা জাহাঙ্গীর ১০ হাজার, তানভীর ২০ হাজার, শফিক ৩০ হাজার, রবি ২০ হাজার ও একজন সুপার ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এর মধ্যে বিমানের লোডারসহ তিনজন রয়েছে।
বিমানের মূল হোতা লোডার তোফাজ্জল ঘুষ হিসেবে নিয়েছেন ৫ হাজার, বিমানকর্মী রফিক ১০ হাজার ও মাহবুব নিয়েছেন ১৫শ’ টাকা।
এরাই মূলত বিমান অবতরণের পর কার্গো ভিলেজে ঢুকিয়ে সুযোগ মতো এক সপ্তাহ বা দু’তিনদিন দেরি করে গোডাউন থেকে মালামাল খালাস করেন। তারা প্রতিটি সিঅ্যান্ডএফের কাছ থেকে পণ্য বুঝে মোটা অঙ্কের ঘুষ হিসেবে নিয়ে থাকেন। শ্যামলের তথ্য অনুযায়ী, একটি চালানে শুধু ঘুষ হিসেবে দিতে হয়েছে ৮ লাখ ২ হাজার টাকা। এ রকম অর্ধশতাধিক চালান কুরিয়ারের মাধ্যমে খালাস হয়ে থাকে বলে সূত্র জানায়।

এ ঘটনায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পদস্থ কর্মকর্তা জানান, সংঘবদ্ধ লুটেরা চক্রটি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী হিসেবে হানা দেয়। সেখানে বাধা দিতে গেলে বিমানবন্দর থেকে রাতারাতি কর্মীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। বিমানবন্দর ও কাস্টমস বিভাগের সর্বত্র শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে আছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সিন্ডিকেট। তারাও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের ‘প্রভাবশালী চক্রে’ পরিণত করেছে। সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং) এজেন্ট হিসেবে শুধু শ্যামলই নয় আরও অনেক চক্র রয়েছে এখানে।

একাধিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কার্গো ভিলেজ থেকে অহরহ সরকারি শুল্ক ছাড়া মালামাল লুটে নেওয়ার দাপুটে কারবার চলে। যুবলীগের আরেক নেতা নাজির হোসেনের গ্রুপও অভিন্ন কর্মে লিপ্ত। নাজির পরিচালনা করেন ডিপিএক্স কুরিয়ার সার্ভিস নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। একইভাবে এ-ওয়াই-জেড এক্সপ্রেস নামে একটি কুরিয়ার সার্ভিস একাধিক ভাড়াটে সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়ে বিমানবন্দরের কাস্টম ভবন ও কার্গো ভিলেজ এলাকা দাপিয়ে বেড়ায়। অস্ত্রশস্ত্র ও হুমকি-ধমকি দেখিয়ে তারাও সরকারি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে জবরদস্তি মালামাল ছাড়িয়ে নিয়ে থাকে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, বিমানবন্দরে ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে রয়েছে কুরিয়ার সার্ভিস। দেশি-বিদেশি এসব কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীরা বড়ই বেপরোয়া। এর মধ্যে সার্বিকভাবে জড়িত রয়েছে উত্তরা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম তোফাজ্জল চেয়ারম্যান, তার বাহিনীর সদস্য সুজন, সুমন, নাইম, আসলাম, ইয়াসিন, শফি, মাসুদ ও রিপনসহ প্রায় ২০ জনেরও বেশি নেতা-কর্মী বিমানবন্দরে বিভিন্ন বাহিনী গড়ে তুলেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বিদেশ থেকে আনা কোটি টাকা মূল্যের বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ক্যামেরা এ-ওয়াই-জেড এক্সপ্রেস এবং এফ-এম-আই ওয়ার্ল্ডওয়াইড কুরিয়ার সার্ভিসের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা লুটে নেওয়ার সময় নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে।

এ বিষয়ে বিমানবন্দর থানার ওসি মো. কামাল উদ্দিন জানান, কাস্টমস বিভাগ যাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে তার মধ্যে সাতজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-পুলিশ। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
বর্তমানে যারা গোডাউনে সক্রিয় রয়েছে তাদের বিষয়ে ওসি জানান, কাস্টমস কর্মকর্তারা আমাদের জানালে আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। তবুও সার্বিক নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা কাস্টমসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করব বলে মন্তব্য করেন তিনি

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

ব্রিটিশ ভিসা সেন্টার নিয়ে সিলেটে যা বললেন রুশনারা আলী

সংক্ষিপ্ত সফরে সিলেটে অবস্থান করছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ বিষয়ক বাণিজ্যদূত ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি রুশনারা …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open