শুক্রবার, এপ্রিল ১৬, ২০২১ : ৬:১১ অপরাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

শেষ রক্ষা হল না আশরাফের- নতুন পরিচয় ‘দফতরবিহীন মন্ত্রী’

সিলেটভিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম : শেষ রক্ষা হল না সৈয়দ আশরাফের। তার নতুন পরিচয় ‘দফতরবিহীন মন্ত্রী’। আওয়ামী লীগের টানা দু’বারের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছ থেকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এখন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। আর এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি হল গত দু’দিন ধরে চলে আসা গুঞ্জনের।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার আরও একদফা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। যদিও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের কি কথা হয়েছে তা জানা যায়নি। এর আগে মঙ্গলবার এ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদ ভবনে সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক কথা বলেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এখন থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আরও জানান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি দেয়া হলেও মন্ত্রী থাকছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তবে তার কোনো দফতর থাকছে না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বিকালে সরকারের এই সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে অবহিত করার পর বিদায়ী স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যুবলীগের ইফতার পার্টিতে প্রধান অতিথি ছিলেন এই দফতরবিহীন মন্ত্রী। অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা ঘিরে ধরলে তিনি এ ব্যাপারে কিছু বলবেন না বলে জানান। অবশ্য মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জে এক ইফতার পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘গুজবে কান দেবেন না।’

মঙ্গলবার একনেক সভার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে তার মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি দেয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ওইদিনই এ সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করে গণভবনে পাঠায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। পরের দিন বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নথিতে স্বাক্ষর করেন বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে। তবে এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশের আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকের পর সৈয়দ আশরাফকে বিমর্ষ চেহারায় বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। দু’দিনের সফর শেষ করে বুধবার রাতে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা ফেরেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

এদিকে যুগান্তরের ফরিদপুর ব্যুরো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার নতুন দায়িত্ব পাওয়ায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ফরিদপুরের বদরপুরস্থ বাসভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত সুখবর, আনন্দের বিষয়। এটি একটি বড় মন্ত্রণালয় এবং আপাতত আমার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও থাকছে, আমি সত্যি আনন্দিত।

মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মূলত ক্ষমতাধর হয়ে আবির্ভূত হন ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা জেলে যাওয়ার পর। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে তিনি লাইমলাইটে আসেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় এলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সৈয়দ আশরাফ। পরবর্তীকালে জাতীয় কাউন্সিলে ভারমুক্ত হয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হন এই নেতা। তিন বছর পর কাউন্সিলে আবারও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করলে আগের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ই থাকে তার অধীনে। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভা ও দলে নিজের প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখেন সৈয়দ আশরাফ। তবে টানা তিন মাসে বিএনপি-জামায়াতের অবরোধ চলার সময় আস্তে আস্তে তার ক্ষমতার ধার কমতে থাকে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ সময় বিএনপির সঙ্গে আলোচনা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৈয়দ আশরাফের সম্পর্কের অবনতি হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার একনেকের বৈঠকে আশরাফকে অনুপস্থিত থাকতে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। ওই বৈঠকের নির্ধারিত এজেন্ডা ছিল ‘গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প-২।’ এ রকম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অনুপস্থিতির জন্য মন্ত্রীর ওপর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সঙ্গে সঙ্গে তার কাছ থেকে দফতর কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী। সে অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশনাও দেন।

এর আগে ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হয়। তবে তার মন্ত্রণালয় নিজের হাতেই রাখেন প্রধানমন্ত্রী। হজ, তাবলিগ জামাত এবং সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে মন্ত্রিত্ব হারাতে হয় লতিফ সিদ্দিকীকে। তবে শুধুই একনেকের বৈঠকে অনুপস্থিত থাকা নয়, সৈয়দ আশরাফের দফতরবিহীন মন্ত্রী হওয়ার পেছনে আরও কোনো কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন তারই সহকর্মীরা। তাদের অনেকেই এ সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে যান। তবে প্রকাশ্যে কেউ কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রী এ ঘটনার পর যুগান্তরকে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ছয় বছর ধরেই দলের শীর্ষ ও তৃণমূল নেতাসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা আশরাফের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি ফোন রিসিভ করতেন না। তাকে প্রয়োজনে পাওয়া যেত না। দিনের পর দিন গুরুত্বপূর্ণ দলীয় মিটিংয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফোনও অনেক সময় রিসিভ করতেন না বলে জানা গেছে। তার জীবনযাত্রা নিয়ে রসালো আলোচনা হতো সরকার থেকে দলীয় ফোরাম পর্যন্ত। এতকিছুর পরও আশরাফই ছিলেন দলীয় ফোরামে শেখ হাসিনার পর সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা।

কিশোরগঞ্জের সংসদ সদস্য সৈয়দ আশরাফ ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেলখানায় সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। ওই সময় লন্ডনে চলে যান সৈয়দ আশরাফ। সেখানে খণ্ডকালীন সাংবাদিকতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার ওই সরকারে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হন আশরাফ। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিটি সংসদ নির্বাচনেই নির্বাচিত হয়ে আসছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চার সহচরের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকারে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। পরে তিনি পদত্যাগ করেন। জাতীয় চার নেতার পরিবারের মধ্যে এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামেরও সদস্য।

খন্দকার মোশাররফ হোসেন : আশরাফের স্থলাভিষিক্ত খন্দকার মোশাররফ হোসেন ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই। তিনি প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে সায়মা হোসেন পুতুলের শ্বশুর। কর্মজীবনে খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রামের প্রথম প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে এলজিইডি বিভাগ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর শেখ হাসিনার সরকারে স্থান হয় খন্দকার মোশাররফের। পরের মেয়াদেও তিনি একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বহাল থাকেন। বৃহস্পতিবার থেকে সরকারে তার দায়িত্ব আরও বাড়ল।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ট্র্যাফিক নির্দেশনা

আসন্ন আওয়ামী লীগের সম্মেলনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিতে আগামী শুক্রবার থেকে রোববার (২১-২৩ অক্টোবর) পর্যন্ত রাজধানীতে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open