বৃহস্পতিবার, মার্চ ৪, ২০২১ : ৬:২২ পূর্বাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

প থে র পাঁ চা লী : মাফ করে দেবেন বঙ্গবন্ধু!

হিলাল ফয়েজী : বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে ১৯৭১ সনে। কিন্তু এই মুক্তির গভীরেও মুক্তি মেলেনি একদল ছিটমহলবাসীর। বাংলাদেশ-ভারতের রাষ্ট্রনেতৃত্ব ২০১৫ সনে এই সেদিন দু’দেশের ছিটমহলগুলোকে ম্ুিক্তর স্বাদ দিতে চ‚ড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন করেছেন। কুড়িগ্রামের মুক্তিপ্রাপ্ত ছিটমহলবাসীরা তাই যেভাবে হাজারে হাজারে রং ছিটিয়ে ফুল ছিটিয়ে আনন্দে মাতাল হয়েছেন, সেই ছবি দেখে ১৯৭১ সনের ডিসেম্বরের মুক্তি আর বিজয়মিছিলের কথা মনে পড়ে গেল। ছিটমহলবাসীদের বন্ধু কুড়িগ্রামের অগ্রণী আইনজীবী আব্রাহাম লিংকন সহ অন্যান্যদের ঐ ছিটমহলবাসীরা যেভাবে আনন্দ অনুভবে রাঙিয়ে দিয়েছেন, সে ছবি দেখে আনন্দ-অশ্রæতে ভেসে গেছি। অপরাধী মনে হয়েছিল নিজেকে। ৪৪ বছর ধরে মুক্ত জমিনে বসবাস করছি। এতো কাছে তবু এতো দূরে। আমাদেরই মাঝে, তবু আমাদের নয়। এই ছিটমহলবাসীদের এতো দুঃখ, এতো কষ্ট।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মসূত্রে মুক্তির মহানায়ক হে বঙ্গবন্ধু, একজন অধম বাঙালি হিসাবে আপনার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাই। ১৯৭১ এর শেষ ভাগ থেকে ১৯৭৫ এর মধ্যভাগÑ এই অল্প ক’দিনে কঠিন-প্রতিক‚লতায় আপনাকে, আপনার সরকারকে অস্থির করে তুলেছিল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ওয়াশিংটন-পিন্ডি-রিয়াদ এর মিলিত জোট এবং ঘোঁট। নবজাত-নড়বড়ে বাংলাদেশকে আঁতুড় ঘরেই গলা টিপে হত্যা করবার কতো যে কুকাÐ চললো। অবশেষে ওরা ভেতরের-বাইরের সবাই মিলে হানলো চ‚ড়ান্ত আঘাত।
বঙ্গবন্ধু, ওরা নৃশংস, পাষন্ড, ভয়ংকর প্রতিশোধপরায়ণ। ওদের প্রধান টার্গেট ছিলেন আপনি। সপরিবারে, স্বজন সমাহারে, শিশু রাসেল-সুকান্ত সহ কতোজনকে সেদিন ওরা আপনাকে সহ বধ করলো। আপনার অপরাধ ছিল, আপনার সাধারণ মানুষকে পাগল করে তোলা অসামান্য নেতৃত্বে আপনি ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে এমন করে জাগিয়ে দিয়েছিলেন যে পৃথিবীর আর পাকিস্তানের মাতব্বররা একযোগে পরাজিত হয়ে গেলো । ‘জেগে ওঠা নব বাঙালি’ ছিল আপনার মূল শক্তিভিত্তি। শির উঁচু করা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশটি তাই চ‚র্ণ করার প্রধান অপারেশনটি ছিল সপরিবারে আপনাকে নিশ্চিহ্ন করা। ওরা ক্ষমতাচক্রের সুলভ মীরজাফরদের ব্যবহার করে ওদের অপারেশনটি সম্পন্ন করেছে অভাবনীয় নির্মমতায়। আপনার রক্তে প্রতিশোধের পরিতৃপ্তির সুরা পানে মত্ত হয়েছিল মার্কিনী ক্ষমতাপান্ডা কিসিঞ্জার। ওরা তখনও,এখনও পৃথিবীকে মানবাধিকারের ছবক দিতে ভন্ডামির তবক দেয়া পান চিবুতে চিবুতে মনোহর বাক্য গড়ে চলেছে।
মাফ করবেন বঙ্গবন্ধু। আপনি বাঙালি জাতিকে যা দিয়েছেন, তা অপরিমেয়। কিন্তু কতো যে অশ্রাব্য-কটু-ক‚ট কথা নানাজনে বলেছে আপনার বেঁচে থাকার সময়ে, আপনার রোমহর্ষক হত্যাকাÐের আগে, পরে। দশকের পর দশক ধরে। সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার ছিলো আপনার মতো উন্নতশির, দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের মূল সত্ত¡াটিকে প্রতিবেশী বড় দেশটির ‘গোলাম’ হিসাবে চিত্রিত করার কুরুচিভরা কাÐসমূহ।
অথচ এই আপনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশে এসে ভারত সফরের প্রথম সুযোগেই ভারতনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন: ‘মহোদয়া, আপনার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে কবে সরিয়ে নেবেন?’ ভারতের যে মিত্রবাহিনী সাহায্যে, শৌর্যে, আত্মদানে, মহান অবদানে, রক্তঋণের বাঁধনে বাংলাদেশের জন্মপ্রক্রিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, বিজয়-উত্তর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলো, তেমনি পটভ‚মিতে এভাবে মুখের উপর সরাসরি জিজ্ঞেস করার মতো মেরুদÐ পৃথিবীতে কোন রাজনৈতিক নেতৃত্ব করে দেখাতে পেরেছিলো কিনা, সে উদাহরণ কেউ দেখাতে পারবেন? সেই আপনাকে ওরা বলে ‘গোলাম’? আপনি নাকি যতো চুক্তি করেছেন সবই গোলামী তথা দাসত্বের দাসখত! যে ‘ইন্দিরা-মুজিব’ চুক্তিটি সম্পদিত হয়েছিলো ১৬ মে ১৯৭৪ সনে, সেই চুক্তিটিতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সম্মতি জানিয়েছিল অতি দ্রæত আপনার জীবদ্দশাতেই। ওরা বলেছিলো, এই চুক্তিটিতে নাকি বাংলাদেশের স্বার্থ বিক্রি করে দিয়েছিলেন আপনি! আজ এতো বছর পর এতো ঘাট ঘুরে ভারতের লোকসভা এবং রাজ্যসভার সকল সদস্যের সমর্থনে ঐ চুক্তিটি সেদেশের সাংবিধানিক সম্মতি পেলো। এবং ঐ ‘ইন্দিরা-মুজিব’ চুক্তিটি নিয়ে আজ ভারত এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যমতো গদগদ। যারা বলেছিলো ‘গোলামীর চুক্তি’, তারাও আজ ছিটমহলবাসীদের মুক্তিপত্র হিসাবে চুক্তিটিকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হচ্ছে। ‘গোলামী তথা দাসত্বের চুক্তি’ এতোকাল পর কেমন করে স্বাধীনতার সপক্ষের, মুক্তির সপক্ষের চুক্তিতে পরিণত হলো কোন জাদুমন্ত্রে, সে কথাটিই ভাবছি বঙ্গবন্ধু। ওরা মাওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’ পত্রিকায় তখন কতো যে না-হক কথা বলেছে, কতো যে পচাগলা-নোংরা-হীন প্রচার চালিয়ে মানুষের মনকে বিষাক্ত করেছে, তার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। কিছু মনে নেবেননা, আপনার মহাসমুদ্রসমান হৃদয়, ওদের নীচতা-হীনতা নিশ্চয়ই আপনাকে স্পর্শ করবেনা, তবু হে বঙ্গবন্ধু, একজন সাধারণ বাঙালি হিসাবে আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনি আমাদের সমাজে প্রদর্শিত এসব ‘দীনতা-হীনতা-নীচতা’ ক্ষমা করে দিন।
বঙ্গবন্ধু, আপনি দেশের ভিতর অনাচার-বিশৃংখলা নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্রæতবেগে তৈরি করেছিলেন রক্ষী বাহিনী। এক ধরণের অস্থিরতা আপনার ভিতর তৈরি হয়েছিল। দেশ বিদেশের ষড়যন্ত্রকারীরা ঠিক এটাই চেয়েছিলো। এ ধরনের বাহিনী দ্বারা ব্যবস্থা নেবার সুফল-কুফল দু’টিই আছে। প্রথমত: প্রবল অরাজকতা কিছুটা দমে এবং কমে আসে। দ্বিতীয়ত: এ ধরনের বাহিনীর অ্যাকশন নিয়ন্ত্রণে থাকেনা। অনেক ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি হয়। ঐ বাড়াবাড়িকে কেন্দ্র করেই চলে শত্রæর ব্যাপক দেশী বিদেশী প্রচারণা।
আর রক্ষী বাহিনী নিয়ে চলছিল সবচেয়ে জঘন্য প্রচারণা এটি যে, আসলে রক্ষী বাহিনী নামের আড়ালে একদল ভারতীয় সৈন্যকে এদেশে নিয়ে আসা হয়েছে। এবং ওরা যা ইচ্ছে তাই করছে। ভারতবিরোধী-সাম্প্রদায়িক হিং¯্র প্রচারণায় তখন বাংলাদেশ ভরপুর। বিশেষত: মধ্যবিত্তদের একটা বড় অংশ এই প্রচারে বিশ্বাস করেছিল। সে সময়টার কথা ভাবলে বঙ্গবন্ধু শিউরে উঠতে হয়। নবজাত সরকার। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পর পর তিনটি বন্যা। ফসল বিপর্যয়।আমাদেও খাদ্যভান্ডার গড়ে ওঠেনি। অবশেষে দুর্ভিক্ষ। কোনভাবেই বিশ্ববাজার থেকে দ্রæত খাদ্য আমদানী করা গেলোনা। সুযোগ বুঝে মার্কিনীরা আমাদের আমদানী করা খাদ্যের জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে এক জটিল ও জরুরি অবস্থার সৃষ্টি করে মানবাধিকারের পেখম নাচ তুললো ইতিহাসের মঞ্চে। অনভিজ্ঞ-নবজাত সরকার একপ্রকার দিশাহারা হয়ে পড়লো। বঙ্গবন্ধু, আপনি জনগণের নেতা। জনগণের এসব দুর্দশা দেখে আপনি কেমন অসহায় হয়ে পড়লেন। মানুষের জন্য আপনার ভালোবাসায় উতরোল হৃদয়খানি কেমন অবসন্ন হয়ে পড়লো। আপনি সবাইকে এক করে রাজনৈতিক সংহতি এনে অর্থনৈতিক বিকাশের অস্থির পদক্ষেপ নিতে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। ভিতরে বাইরে শত্রæর চাপ। বিপরীতে আপনার মহাউদ্যোগ। সে এক কঠিন সময়। শত্রæ আপনাকে ‘মহাএকনায়ক’ বলে কুৎসা ছড়াতে থাকলো। আপনার একান্ত চাওয়াটুকুকে বিকৃত-ধিকৃত করে ব্যাপক প্রচার চললো। ওদিকে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য বেড়ে দেশের দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলো কয়েকগুণ। যে কোটি বাঙালি ছিল মুজিব-অন্তপ্রাণ, জীবনের কঠিন চাপে ওরাও কেমন যেন হয়ে গেলো। এমনি পরিস্থিতিতে সবাইকে নিয়ে একটি দল করে সামনে এগুবার যে প্রচেষ্টা ছিল আপনার, সেটিকেও বিতর্কিত করে তোলা হলো পরিকল্পিতভাবে। পুরো প্রচারাভিযান আর সামরিক প্রতিবিপ্লবের ষড়যন্ত্র-পাঁয়তারার মূল গোপন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ছিলেন ঐ মার্কিনী হেনরী কিসিঞ্জার। একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ তাদের যে নিতেই হবে।
নির্মমভাবে নিলো তারা সেই প্রতিশোধ। যারা এতোদিন প্রচার করেছিলো, রক্ষী বাহিনী ভারতীয় সৈন্য দিয়ে গঠিত, তারা সেই রক্ষী বাহিনীকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে নিলো। তাহলেতো প্রচারকুৎসা অনুযায়ী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকারান্তরে ‘ভারতীয় সৈন্যে’ ভরপুর করে দিলো! যেসব জ্ঞানপাপী মধ্যবিত্ত বিশ্বাস করতো রক্ষী বাহিনীতে ‘ভারতীয় সৈন্য’ আছে, সেই রক্ষী বাহিনীকে সেনা বাহিনীর ভিতর মিশিয়ে দেবার সময় তারা কিন্তু কোন অসুবিধা বোধ করেনি।
মিথ্যার বেসাতি ছড়াতে ওদের প্রচারণা-ওস্তাদী ছিল মারাত্মক। আপনাকে হত্যার পরও দশকের পর দশক কথায়, পাঠ্যপুস্তকে, আসরে, ওয়াজে ওরা কতো যে কুৎসা ছড়িয়েছে। আর আজ? ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিই এখন হয়ে দাঁড়ালো দু’দেশের জনগণের কাছে ’আদর্শ চুক্তি’। আজ ছিটমহলের মানুষগুলোর কাছে ঐ চুক্তির পরমার্থ দাঁড়ালো, ৬৮ বছর ধরে তিলে তিলে যন্ত্রণায় ভোগার মহা অভিশপ্ত জীবন থেকে মহামুক্তির এক দারুণ অনুমোদন। বঙ্গবন্ধু এখানেই আপনার দূরদর্শী ভ‚মিকার মহান বিজয়। সেদিনের সেসময়ের কুৎসাপ্রচারকারী বেল্লিকদের কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছে, আর এখনও আছে তাদের অনেক অনুসারী। যদি সাহস থাকে, ছিটমহলবাসীর কাছে গিয়ে তোরা একবার বল, ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি হলো গোলামী আর দাসত্বের চুক্তি, ওরা তোদেরকে সঙ্গে সঙ্গে পাগলা গারদে পুরে দেবে। বঙ্গবন্ধু, ঠিক এখানেই আপনার ভ‚মিকার অমরত্বের অনবদ্য বিজয়।
ওরা বলেছিল বাংলাদেশ-ভারত ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি গোলামীর চুক্তি, দেশ বিক্রির চুক্তি। তা বঙ্গবন্ধুতো মাত্র সাড়ে তিন বছর বেঁচে ছিলেন। বাকী সময়তো ঐ সীমার পামরেরা নানাভাবে, নানারূপে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল দীর্ঘ সময়। কই, ক্ষমতায় থাকার সময়তো আর মিথ্যার খই ফুটলোনা ওদের কথায়, এ ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি মেনেইতো ওরা কী সুন্দর চালিয়ে গেলো ওদের জবরদস্তির রাজত্ব! গোলামীর ২৫ বছরের চুক্তি বাতিলের ক্ষমতা ছিল, তা একবারও তো বাতিলের সামান্য উদ্যোগ নিলোনা কেন ঐ মিথ্যাসেবী বর্বরেরা।বঙ্গবন্ধু, এমন ভন্ড, আত্মপ্রতারক, মিথ্যার উপাসকই ওরা, ওদের ওসব নোংরা কুবচনে মনে কিছু নেবেননা। মিথ্যা একসময় পরাজিত হবেই। মিথ্যা মুখ থুবড়ে পড়বেই।সেটাই প্রমাণিত হলো আবার ।
বঙ্গবন্ধু, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট আপনার দু’টি কন্যা দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন। সেই দুই কন্যার একজন একসময় অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা-অপমানের মধ্য দিয়ে দেশে ফিরে কঠিন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করলে। অনেক ধৈর্য, সাধনা, কৌশল এবং বুদ্ধিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় একসময় ১৯৯৬ সনে আসীন হলেন। তারপর আপনার হত্যাকাÐের বিচার করার মতো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিলেন। প্রতিক্রিয়াশীল এক রাষ্ট্রযন্ত্রকে ক্রমে ক্রমে অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরিয়ে আনবার নানা ভ‚মিকা নিলেন আপনার কন্যা। কিন্তু তাঁর অনমনীয় দৃঢ়তার জন্য দূরের কাছের কোন শক্তিই তাকে ক্ষমতায় চাইলোনা। ২০০১ সনে আপনার কন্যাকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করা হলো বিশাল ষড়যন্ত্রে। তারপর ২০০৭ সনেতো ক্ষমতা থেকে চিরতরে সরিয়ে দেবার বড় রকমের ষড়যন্ত্র হলো। কিন্তু তৃণমূলে আপনার দলটির যে ভিত্তি তার কাছে মাথা নোয়াতে হলোই দেশ বিদেশের শক্তিকে। ২০০৮ সনে আপনার কন্যা ক্ষমতায় ফিরে এলেন ফের। জনক হত্যার বিচারের রায় কার্যকর করলেন তিনি। এবার স্বাধীনতার এতো বছর পর এক অভাবনীয় সাহসের পরিচয় দিয়ে শুরু করলেন যুদ্ধাপরাধের বিচার।
আর এই বিচার বন্ধ করার জন্য ঐ পেট্রোডলারের বাহিনী পেট্রোল বোমা সহ নাশকতার যতো রকম বর্বরতা আছে, তার সবই প্রয়োগ করে দেখালো কয়েকটি বছর ধরে। ২০১৫ সনেও ৯২ দিন চললো ওদের হিং¯্র বর্বরতা। ২০ দলীয় জোটের নামে চললো ওদের বিষ ছড়ানোর প্রচারণা। এখনতো আবার সোশাল মিডিয়ার প্রযুক্তি। ঐ অন্ধকার পশ্চাদপদশক্তি এই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে হিংসার ভয়াবহ বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে। কক্সবাজারের রামু সহ এখানে সেখানে সাম্প্রদায়িক সহিংস আক্রমন ঘটাবার বুদ্ধি ওদের ঘটে বেশ ভালোই আছে। দেশের রাজনীতির এক বড় জায়গায় আছেন এদেশের একজন জেনারেল পতœী। আর তার ’সুযোগ্য’ তনয়। যুদ্ধাপরাধীদের সাথে জোট-ঘোঁট-নোটের কারবারে মিলে মিশে হিংসার নারকীয় বিস্তারে চেষ্টার এতটুকু ত্রæটি করেনি ঐ বিষজোট। এই ‘দেশনেত্রী’ কে জীবনের এক কঠিন সময়ে আপনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অনেক ‘উপকার’ করেছিলেন বলেই বুঝি ‘প্রতিদান’ও পেয়েছেন আপনি বঙ্গবন্ধু। আপনাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেটাকেও প্রায়শঃ নানা কৌশলে ‘বৈধতা’ দেবার নির্মমতা প্রদর্শনে উনি দ্বিধাহীন নন। আপনার শাহাদত দিবসে উনি ওনার নবজন্ম আবিষ্কার করার সুবাদে বোধ করি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পাবার মনোনয়ন পেতে পারেন ।
যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করার জন্য নানাভাবে, নানা কৌশলে কম চেষ্টা করেননি ‘দেশনেত্রী’ এবং তার ‘বিষ’-দলীয় জোট। আমাদের পশ্চিমা দুনিয়া কৌশলে তারই পাশে দাঁড়িয়েছে বারংবার। সেই একাত্তরেও, এবারও। আমাদের একদল বক বক টক টক সুশীলেরাও পশ্চিমা দূতাবাসের তাঁবেদারে পরিণত হয়ে কার্যতঃ আপনার কন্যাকে ক্ষমতাচ্যূত করার জন্য কম করেনি। ২০০৪ সনে আপনার কন্যাকে হত্যা করার যে অভিযান চলে, আমাদের নানা ‘মানবাধিকার’ পুঙ্গবেরাও সেটার বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলেনি। এসব ভন্ড, প্রতারক, বিবেকবিহীনদের এখনও প্রচÐ দাপট এই দেশে।
সব কিছু মিলিয়ে তবুও এক অভাবনীয় সাহসে চলছেন আপনার কন্যা। তাঁর প্রধান শক্তি হচ্ছে দৃঢ়তা, তবে সুশাসনের ঘাটতি মেটাতে তাকে যেতে হবে অনেকদূর। ষাটের দশকের সেই ছাত্রকর্মীরা আজ কোথায়? আজ আদর্শের চর্চা কেন যেন ‘মালপানি’র কোপে পড়ে নিহত হচ্ছে দেশ জুড়ে। বঙ্গবন্ধু, আপনার সাহস, দৃঢ়তা আর আদর্শের ভিত্তিভ‚মিই যদি দেশ জুড়ে এমন ¤্রয়িমান হয়ে পড়ে, তাহলেতো আপনাকে হত্যাকারীদের আসল সাফল্য ঘটবে সেখানেই।
আজ দেশে উন্নয়নের চাকা ঘুরছে, নানাভাবে শিল্পে, কৃষিতে, অবকাঠামো নির্মাণে, প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে, স্বাস্থ্যে বাংলাদেশের সাফল্য অমর্ত্য সেনদেরও মুগ্ধ করে চলেছে। কৃষিখাতে আর বিদ্যুৎ বিস্তারে আপনার কন্যার সরকারের সাফল্য আজ প্রশ্নাতীত। তবু বলুন, সুন্দরবনের অতো কাছে ঐ রামপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পটি কি না করলেই নয়? এসব কথা আপনাকে বলছি, কেননা আপনার জীবদ্দশায় আপনার পাশে গিয়ে এমনি সুরে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। নিরাপত্তার ঘেরাটোপে পড়া আপনার কন্যার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতার সুযোগ যে আমাদের মতো সাধারণদের দুর্লভ হয়ে পড়েছে।
আপনার কন্য অপরিসীম খেটে চলেছেন। দক্ষিণ এশিয়া ভিত্তিতে যোগাযোগ বিন্যাসের একালের চাহিদা মেটাতে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এসব সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী। ২০২১ সন এবং ২০৪১ সন-এর ভিশন- সব মিলিয়ে চলছে দূরদর্শী পদক্ষেপ।
গম্প্রতি এসেছিলেন প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতার প্রধান কান্ডারী। তাঁর পাশে ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে অতিথি আপ্যায়ন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে আপনার কন্যা বেশ উজ্জ্বল ভ‚মিকা রেখেছেন। বিপরীতে এতকালের ‘আপসহীন’ নেত্রীর পরিস্থিতি দেখে ভারি করুণা হলো। আপসহীন সেই ‘ মেরুদন্ড’ বিগলিত হয়ে গেল। প্রতিবেশী কান্ডারীর কৃপা সাক্ষাৎ পাবার জন্য কী যে হ্যাংলামো করলেন। আমাদের দেশের ২+ বারের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর এমনি ব্যক্তিত্বহীনতা যে দেশের সম্মানও ভ‚লুণ্ঠিত করে।
এমনি ‘আপসহীন’ নেত্রীও অবশেষে ফের ফোঁস করে উঠেছেন। প্রতিবেশী কান্ডারীর সফরের পর ফের ভোল পাল্টানো। এই সফরের সব চুক্তিই নাকি ‘দাসত্বের’ চুক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তির সময়ও ওরা বলেছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এর ফলে ভারতের অংশ হয়ে যাবে। তা গিয়েছে কী হে ‘দেশনেত্রী’? বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমতায় গেলে নাকি আজান দেয়া যাবেনা? তা কোথাও কখনও একটি বারের জন্য আজান দেয়া বন্ধ হয়েছে কী? বরং মসজিদ বেড়ে আজানতো বেড়েই চলেছে ধর্মপ্রাণ মানুষদের এই বাংলাদেশে।
বঙ্গবন্ধু ক্ষমা করবেন। আপনার সৃষ্ট সুপ্রিয় বাংলাদেশের ভিতর এখনও এমনি নোংরা-ময়লা-জঘন্য কথা বলা উঁচু উঁচু ব্যক্তি ও মহলের অভাব নেই। জীবদ্দশায়ও এদের আপনি উপেক্ষা করেছেন। নিশ্চয়ই এখনও করবেন। কবি রবির সুরে সুরে তাই গেয়ে উঠি ঃ‘এই দীনতা ক্ষমা করো ’।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

সেই রাবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ

আত্মহত্যা’ করা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলির সাবেক …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open