বৃহস্পতিবার, জুন ২৪, ২০২১ : ৯:৫৫ অপরাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

ইরাক ভেঙে দুটি রাষ্ট্র হচ্ছে !

ইরাক বলে যে দেশটি আমরা চিনতাম সেটা এখন আর আগের মতো নেই। ২০০৩ সালে দেশটিতে মার্কিন সামরিক অভিযানের পর এক যুগ পার হয়ে গেছে। যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে এখনও বের হয়ে আসতে পারেনি ইরাক। প্রতিনিয়ত সহিংসতা এক পরিচিত চিত্র সেখানে। সাবেক মার্কিন সিআইএ কর্মকর্তা রবার্ট বায়েরের মতে ইরাককে ভেঙে দুটি ভিন্ন রাষ্ট্র করা উচিত। অনলাইন সিএনএন-এ প্রকাশিত এক লেখায় তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি এভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ইরাক এখন অতীত হয়ে গেছে। পরিচিত ওই ইরাক আর ফিরে আসবে না। আমাদের এখন এ বাস্তবতা মেনে নেয়ার সময় এসেছে। ইরাক অভিযানের ১২ বছর গত হয়েছে। কিন্তু ইরাকের শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে দেশটির সুন্নি আরবরা আগের তুলনায় অনেক কম আগ্রহী। বিশেষ করে যখন ওই সরকারের সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র রয়েছে। সুন্নিরা এখন যেটা দেখছে তা হলো- তাদের একমাত্র বিকল্প হলো আলাদা হয়ে যাওয়া। কাজেই সপ্তদশ শতকের ফরাসি কূটনীতিক ট্যালের‌্যান্ড যেমনটা পরামর্শ দিয়েছেন- অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আগে থেকে অনুধাবন করা এবং সেটার বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করাই উত্তম। এক্ষেত্রে আমাদের এটা মেনে নেয়া প্রয়োজন যে ইরাক আর নেই। হ্যা, বাগদাদ হয়তো আইএসের কাছ থেকে রামাদি পুনর্দখল করতে পারে। আর পর্যাপ্ত মার্কিন আর ইরানি সহযোগিতা পেলে তারা মসুলও পুনর্দখল করতে পারবে। কিন্তু কতটা মূল্য দিয়ে সেটা করা যথার্থ? শহরগুলো দখল করতে প্রয়োজন হবে আকাশপথে ব্যাপক মাত্রার বোমাবর্ষণ আর রাস্তায় রাস্তায় স্থল যুদ্ধ। সেটা বিবেচনায় মূল্যটা অনেক চড়া হবার সম্ভাবনাই বেশি। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শিয়া-নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে বসবাস করতে সুন্নিরা খুব বেশি ইচ্ছুক হবে না। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে ভাবতে হয় মার্চ মাসে তিকরিতে আইসিস আসলে হেরেছে কিনা। দলটির যোদ্ধারা হয়তো তিকরিক হারিয়েছে। কিন্তু এর ফলে আইসিস এটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, সুন্নিদের দুমড়ে মুচড়ে দিতে বাগদাদ কোন কিছুতেই প্রশমিত হবে না। তিকরিতের চরম ধ্বংসযজ্ঞ আর শহরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে শিয়া মিলিশিয়াদের লুঠ আর হত্যার ঘটনাগুলো আইএসের প্রচারণার পক্ষেই কাজ করেছে। এর সঙ্গে যোগ করুন আরেকটি বাস্তবতা। তা হলো তিকরিত দখল করতে বাগদাদতে বিদেশীদের (যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান) ডাকতে হয়েছে। এতে করে সুন্নিদের যা যা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন তা তারা হয়েছে যে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চলছে। আর একমাত্র যারা তাদের জীবিত রাখছে তারা হলো আইসিস। আমাদের আইসিস নিয়ে এটা বুঝতে হবে যে তারা একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের থেকে অনেক বেশি কিছু। এটা শুধু আল-কায়েদার দ্বিতীয় ভার্সন নয়। আইসিস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়। একইসঙ্গে তারা একটি গেরিলা দল যারা নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। এর পেছনে অবশ্য স্থানীয় জনগণের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইরাকের কুর্দী এলাকাগুলোতে আইএস তাদের অবস্থান ধরে রাখতে না পারার পেছনে একটি কারণ হলো, কুর্দিরা সঠিকভাবেই বুঝতে পেরেছে যে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। আর ঠিক এই একই কারণে আইসিস কখনই শিয়াপন্থি বাগদাদের দখল নিতে পারবে না। অথবা বিষয়টিকে এভাবে দেখতে পারেন: কতিপয় সুন্নি আরব আইসিসের কট্টরপন্থি ভাবাদর্শ আর বিবেকবর্জিত সহিংসতার প্রতি সমর্থন দিয়েছে। আর এ সমর্থন তারা দিয়েছে উত্তম বিকল্পের অভাবে। কিন্তু তারা আইসিসকে দেখে থাকে স্কুলজীবনের বখাটে ছেলেদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে যারা চরম আতঙ্ক আর ভীতির কারণ কিন্তু অন্তত তাদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে দেয়। সিরিয়ায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট ফোর্ড বলেছেন, ওসামা বিন লাদেন ও আয়মান আল জাওয়াহিরির মতো প্রত্যেকের জন্য ৫০ জন করে আইএসে যোগ দিচ্ছে… তবে কোন আদর্শের জন্য নয়, ক্ষোভে।
অন্য কেউ বলার আগে উল্লেখ করা যাক, ইরাকের সুন্নি আরবরাও একেবারে দুধে ধোয়া তুলসি পাতা নয়। বাগদাদের বর্তমান শিয়া শাসকগোষ্ঠীর তুলনায় সাদ্দাম হোসেন অনেক বেশি নৃশংস ছিলেন। তিনি ও তার সুন্নি সংখ্যালঘুকে ক্ষমতায় রাখার একমাত্র লক্ষ্যে সাদ্দাম তার নিজ দেশের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে অবিবেচনাপ্রসূত এক যুদ্ধে তিনি ১০ লক্ষাধিক ইরাকিকে হত্যা করেছেন। সৎ সুন্নিরা সাদ্দামের ভুলগুলো স্বীকার করবেন। কিন্তু এখন তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের স্রেফ একটা স্বসস্ত্র বাহিনী দরকার যারা তাদের রক্ষা করবে। তাছাড়া ইরাক ভেঙে গেলে কি আমাদের খুব বেশি কিছু কি যায় আসে? ইরাক অভিযানের পর এক যুগের বেশি হয়ে গেছে। দেশটিকে ঠিক করার জন্য লাখ লাখ কোটি ডলার অপচয় করা সত্ত্বেও আমরা যা দেখাতে পারছি তা হলো আরও গৃহযুদ্ধ। 
মনে রাখতে হবে যে আধুনিক ইরাক বস্তুত সুগঠিত কোন দেশ না। দেশটির সীমান্ত চিহ্নিত করা হয়েছে অযত্নে। প্রথমে এটা করেছে অটোমানরা। আর এরপর ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা- যাদের দেশের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে গভীর কোন জ্ঞান ছিল না। ইতিহাসের ভুলগুলো ধরে রাখার জন্য এভাবে চেষ্টা করে যাওয়ার যথার্থতা আছে কি? আল-আনবার প্রদেশের মধ্যপন্থি সুন্নি কিছু বন্ধুরা আমাকে বলেছেন, ইরাকে কিছু নামগন্ধ অন্তত রক্ষা করার আশা একেবারে ছেড়ে দেয়া উচিত হবে না। সংবিধান পুনর্লিখন করে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত কেন্দ্রীয় সরকারি পদ্ধতি সৃষ্টির মাধ্যমে সেটা করা সম্ভব বলে তারা উল্লেখ করেন। বাগদাদের সঙ্গে কুর্দী আঞ্চলিক সরকারের যে বোঝাপড়া রয়েছে তেমন কিছু একটা ভাবছেন মধ্যপন্থি ওই সুন্নিরা- কোন কেন্দ্রীয় সেনাদল বা পুলিশ সুন্নি এলাকাতে থাকবে না আর তেল রাজস্বের একটি ন্যায্য অংশীদারিত্ব থাকবে। তারা এটা স্বীকার করেন পরস্পর মিশ্রিত জনসংখ্যাকে ভাগ করাটা জটিল। বিশেষ করে কিরকুক ও বাগদাদের মতো শহরগুলোতে। তাদের সমাধান হলো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে এগুলোকে ‘মুক্ত শহরে’ পরিণত করা। কিন্তু ইরাকের সুন্নিরাই কি শুধু এভাবে ভাবছেন? তেহরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর মাধ্যমে আমি এ ধারণাটি তাদের কাছে পৌঁছেছিলাম। তিনি আমাকে নিশ্চিত করেছেন (অন্তত ব্যক্তিগতভাবে), ইরাক বিভক্ত হলে তেহরানের কোন আপত্তি থাকবে না। তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র এভাবেই ইরাকের শিয়াদের নিয়ন্ত্রণ করার আশা করতে পারে ইরান। পশ্চিম ইরাকের কিছু মরুপ্রান্তরে সুন্নিরা রাজত্ব করলে তাদের কিছু যায় আসে না।’ আমি উপলব্ধি করি যে, এ বিষয়ে ঐকমত্য আসা অনেক দূরের কথা। আর এটা অনেক বেশি জটিল বলে মনে হতে পারে। তাছাড়া, ইরাকের অবশ্যম্ভাবী বিভক্ত হওয়ার বিষয়টি ‘কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা’ দিয়ে তেমনটা আড়াল করা যাবে না। কিন্তু সুন্নিদের বিরুদ্ধে পৃথিবী কাঁপানো অভিযানের থেকে এটা উত্তম। সেই সঙ্গে এটা আইসিসের আবেদনকে কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

চীনে টর্নেডো-শিলাবৃষ্টিতে ৯৮ জনের মৃত্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীনের পূর্বাঞ্চলীয় জিয়াংসু প্রদেশে টর্নেডো ও শিলাবৃষ্টির আঘাতে কমপক্ষে ৯৮ জনের মৃত্যু …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open