সোমবার, মে ১৭, ২০২১ : ৯:৩৫ পূর্বাহ্ন
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদঃ

খেলাফতে উসমানির রক্তধারা ॥ ইব্রাহিম খলিল ও ফাতেহা মাশরুকা

তাবলীগের সাথী ইব্রাহিম খলিল হত্যাকা- এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। ‘স্ব-স্বীকৃত খুনি’ স্ত্রী ফাতেহা মাশকুরাও তাবলীগের মাসতুরাত (মহিলা শাখার) সাথী। একই সাথে নগরীর বিভিন্ন স্থানের ‘তালিম’ (দ্বীনি শিক্ষা আসর) এর ‘মুআল্লিমা’ (শিক্ষিকা) ছিলেন তিনি। ইব্রাহিম খলিলের নির্মম খুন পীড়িত করেছে সকলকে। একই সাথে বিস্মিত ও নানা প্রশ্নের তৈরি করেছে তাঁর ‘ধর্মপরায়ন’ স্ত্রীর খুন করার ব্যাপার নিয়েও। সব সূত্র আর ব্যক্তিরাই বলছেন, ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী অত্যন্ত ‘আমলদার’ ও আল্লাহওয়ালা ছিলেন। তাদের উভয়ের পারিবারিক মর্যাদাও অনেক উপরের। দু’জনই সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারের উত্তরাধিকারি। স্ত্রী ফাতেহার পিতা ডা. মুফিজুর রহমান কাকরাইলের (তাবলীগের কেন্দ্রীয় মারকাজ) শুরা সদস্য। আর ইব্রাহিমের পিতা তো ছিলেন মুসলমানদের সর্বশেষ খেলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা ‘খেলাফতে উসমানিয়া’র কর্মকর্তা।
ইব্রাহিম চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিক্সে মাস্টার্স করেছেন। ভালো সরকারি চাকুরির সুযোগও পেয়েছেন। কিন্তু সব কিছুর ওপর ‘দ্বীনের দাওয়াত’ (তাবলীগ)কে গুরুত্ব দিয়েছেন। একই পথের পথিক ছিলেন স্ত্রী ফাতেহাও। তাঁর ধর্মপালন ও পর্দাপথা প্রায় ‘প্রবাদতুল্য’। মাহরাম (বিয়ে নিষিদ্ধ) ছাড়া আর কোনো পুরুষ তাকে কখনো দেখেননি। এমনকি ভাতিজা, ভাগনারাও না। সবার সাথে তিনি কঠোর পর্দা পালন করে চলতেন। অন্যদেরও তা মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতেন। এমন একজন নারীই কি না একা খুন করেছেন তার স্বামীকে! হিসেব মিলেতে পারছেন না কেউ। ফাতেহা নিজে ‘স্বীকার’ করার পরও তাঁর নিজের ও স্বামীর আত্মীয় স্বজনরাও বিশ্বাস করতে পারছেন না, খুনটা তিনি করেছেন। তবে, তারা চান এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হোক। সত্যিকারেই যদি স্ত্রী খুন করে থাকেন, তবে তার সাজা হোক।
উসমানি খেলাফতের রক্তধারাঃ ইব্রাহিম খলিলের পিতা সাদ উদ্দিন আল হাফিয ছিলেন উসমানি খেলাফতের কর্মকর্তা। এই ব্যাপারে বিস্তারিত বলার আগে আমরা উসমানি খেলাফত সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা সংযুক্ত করছি। ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত আজকের মধ্যপ্রাচ্য রোমান সা¤্রাজ্যের শাসনাধীন ছিল। ওমর (রা)-এর শাসনামল (সপ্তম শতাব্দী) হতে রোমানদের শক্তি খর্ব হতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় ১০৪৮ সালের যুদ্ধে সেলজুক তুর্কি মুসলিমরা এশিয়া মাইনরে (তুরস্ক ও আশপাশ অঞ্চল) বাইজেন্টাইনদেরকে (রোম সা¤্রাজ্যের পূর্বাঞ্চল) পরাজিত করে। ১০৭১ সালের ২৬ আগস্ট সংঘটিত মানযিকার্টের যুদ্ধে জয় লাভের মাধ্যমে তুরস্কে (তৎকালীন সময় থেকে খেলাফতের পতনের আগ পর্যন্ত বর্তমান তুরস্কের ইস্তাম্বুল বাদে এশীয় অংশটুকু আনাতোলিয়া নামে পরিচিত ছিল) সেলজুক শাসন পাকাপোক্ত হয়। কয়েক শতাব্দী পর সেলজুকরা দুর্বল হতে শুরু করে। আনাতোলিয়ার ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর সাথে বিচ্ছিন্নতা ও মোঙ্গলদের সাথে শক্তির ভারসাম্যে ক্রমশ পিছিয়ে যেতে থাকে সেলজুকরা। অপরদিকে, উসমান গাজীর নেতৃত্বে তাঁর বাহিনী তুরস্কের সর্ব পশ্চিমের নগর বুরসাতে বাইজেন্টাইনদের বিভিন্ন দুর্গ দখল করে দ্রুত শক্তি অর্জন করতে থাকে। ধীরে ধীরে তাঁরা এ অঞ্চল থেকে সেলজুকদের বিতাড়িত করে প্রভাব বাড়াতে থাকে। ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) জয় করার মধ্য দিয়ে উসমানিয় খেলাফত পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সা¤্রাজ্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে।

প্রায় সাড়ে চার’শ বছর ধরে এশিয়ার বৃহদাংশ, উত্তর আফ্রিকা, ইউরোপের বলকান ও ককেশাশ অঞ্চলে উসমানীয় খেলাফতের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই উসমানীয় খেলাফতের প্রতাপ কমতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তা বিলীন হতে শুরু করে। মূলত বলকান অঞ্চলে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতেই ১৯১৪ সালে খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের কারণে তিনি রাশিয়ার বিপরীতে জার্মানির পক্ষে অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত সব অঞ্চল হারিয়ে উসমানীয় খেলাফত শুধু তুরস্কে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারপরও ইউরোপীয় প্রতিবেশীরা পরাজিত তুরস্ককে পুরোপুরি দখল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। এ লক্ষ্যে ইউরোপীয় সৈন্যদলগুলো তুরস্কের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৯১৯, ১৯২২ এবং সর্বশেষ ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ উসমানিয় খেলাফতকে চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয়রা মুসলমানদের উপর নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। দলে দলে উসমানি খেলাফতের এলাকা থেকে মানুষ হিজরত করতে থাকেন।

মক্কা থেকে ভারতবর্ষঃ ইউরোপীয়দের নির্যাতন থেকে সাধারণ মানুষ থেকে নিয়ে উসমানি খেলাফতের কর্মকর্তারাও মুক্ত ছিলেন না। এমন প্রেক্ষাপটেই ১৯১৯ সালে ভারতবর্ষে পা রাখেন ইব্রাহিম আবু খলিলের পিতা সাদ উদ্দিন আল হাফিয। হিজরত করে ভারতে আসার আগে মক্কায় তিনি উসমানি খেলাফতের কালেক্টরেট ছিলেন। এই তথ্য আমাদের দিয়েছেন ইব্রাহিম খলিলের ভাতিজা (বড় ভাই আব্দুল্লাহর ছেলে) সিলেটের পরিচিত মুখ মাহমুদ বাঙালি। মাহমুদ বাঙালি আমাদের বলেন, তাঁর দাদা সাদ উদ্দিন আল হাফিয মক্কায় উসমানি খেলাফতের কর্মকর্তা ছিলেন। মক্কায় আগন্তুক কাফেলার প্রবেশের জন্যে তখন একটি গেইট ছিল। এই গেইট প্রতিদিন ফজরের পর খোলা হত, সন্ধ্যায় বন্ধ করা হত। সেই গেইট দিয়ে প্রবেশকারী কাফেলার কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতেন সাদ উদ্দিন আল হাফিয। ইউরোপীদের নির্যাতন শুরু হলে ভারতে বুম্বাইয়ে তিনি হিজরত করেন। তাঁর সাথে আসেন আরও তিন ভাই। তাঁরা হলেন, বড় ভাই সাঈদ উদ্দিন ও ছোট ভাই মঈন উদ্দিন। বুম্বাইঢে এসে প্রথমে আগরের ব্যবসা শুরু করেন।

বুম্বাই থেকে বড়লেখা : বুম্বাই থেকে পরে তাঁরা বর্তমান সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় চলে আসেন। এই উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের শালদিগা গ্রামে তাঁরা বসতি স্থাপন করেন। এখানে এসে তাঁরা ব্যবসার সাথে ধর্মপ্রচারে মনোনিবেশ করেন। সাদ উদ্দিন আল হাফিযকে এলাকার লোকেরা ‘পীর-দরবেশ’ হিসেবে বরণ করে নেন। বিয়ে-শাদীও করেন বড়লেখায়।

সাদ উদ্দিনের পরিবার : উসমানি খেলাফতের কর্মকর্তা সাদ উদ্দিনের নাতি মাহমুদ বাঙালি জানালেন, তাঁর দাদা দুই বিয়ে করেছিলেন। দুটোই সুজানগর ইউনিয়নে। ঘটনাচক্রে দুই স্ত্রীর নামও ছিল একÑ নাজমুন নেছা। এই দুই স্ত্রীর গর্ভে জন্মে নেন ৭ ছেলে ও ৭ মেয়ে। তাঁরা হলেন, আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, আব্দুর রহিম, আব্দুল আউয়াল (১৯৭১ এ পাকবাহিনীর সাথে নিহত), আব্দুল মুহসিন। এই পাঁচজনই তাঁদের পিতা থাকা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। বেঁচে ছিলেন আব্দুল হাই (বর্তমানে দুবাই প্রবাসী) ও ইব্রাহিম আবু খলিল। দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি নিহত হলেন। উসমানি খেলাফতের কর্মকর্তা সাদ উদ্দিনের এক ছেলে (আব্দুল হাই-ই) এখন বেঁচে আছেন। তাঁর কন্যারা হলেন, হালিমা খাতুন, ফাতেমা খাতুন (এঁরা মৃত) আছিয়া খাতুন (যুক্তরাজ্য প্রবাসী), সালওয়া খাতুন, আজিজা খাতুন, যয়নব খাতুন ও নাজমা খাতুন (যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী)।

সুজানগর থেকে সিলেট : ১৯৬০ সালে সাদ উদ্দিন সিলেটে এসে নগরীর সওদাগরটুলায় (বর্তমানে ১নং বাসা) বসতি স্থাপন করেন। নগরীর হাসান মার্কেটে দোকান, ধোপাদিঘীরপাড়, চারাদিঘীরপাড়সহ বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি করেন। দাদার সম্পত্তি কেমন ছিল এমন প্রশ্নে এসব উত্তর দিয়ে মাহমুদ বাঙালি বলেন সুজানগরে তাদের প্রায় ৭০ বিঘা জমি জমি রয়েছে। তাদের দাদা গ্রামে যে বাড়ি করেছিলেন সেটির ভিটা ৯/১০ কিয়ার জমির উপর। বাড়ি ভেতরই রয়েছে মসজিদ, স্কুল ও ছোড়-বড় দুটা পুকুর। তবে এখন ওই বাড়িতে তাদের কোনো উত্তরসূরী থাকেন না। মাহমুদ বাঙালি বললেন, দাদার রেখে যাওয়া সব সম্পত্তি দেখভাল করতেন চাচা ইব্রাহিম খলিল। দাদার কোনো সম্পদই এখনও ভাগবাটোয়ারা হয়নি বলে তিনি জানালেন।

তাবলিগের সাথী, আমির ননঃ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিহত ইব্রাহিম খলিলকে তাবলিগের আমির পরিচয় দেওয়ায় আপত্তি জানিয়েছেন সিলেট তাবলিগের শুরা সদস্য সুয়েজ আফজাল খান। নগরীর জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদরাসার এই শিক্ষক ও কর্মকর্তা বলেন, ইব্রাহিম খলিল তাবলিগের সাথী ছিলেন। তিনি আমির নন। এমনকি সিলেট যে চার-পাঁচ সদস্যের শুরু রয়েছে সেটিও কেউ নন তিনি। নির্মম এই খুনের ঘটনাকে দুঃখজনক আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, তাদের দাম্পত্য সমস্যার কথা কখনো আমরা শুনিনি।

এছাড়াও নিম্নের সংবাদগুলো দেখতে পারেন...

বিশ্বনাথে ধর্ষণের অভিযোগে ইউপি মেম্বার গ্রেফতার

সিলেটের বিশ্বনাথে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীকে ধর্ষণ করার অভিযোগে উপজেলার দৌলতপুর ইউপির ১নং ওয়ার্ডে মেম্বার …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Open